দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবার অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। বাজারের চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ না থাকায় ডলারের দাম বাড়তির দিকে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত প্রবাসী আয় এবং রফতানি আয়। সম্প্রতি দু’টি খাতেই আয় কমেছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়। এর কারণ মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বিপুল বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০-৭০ থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছুঁতে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সার আমদানিকারী সরকারি সংস্থাগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়েছে। তেল-গ্যাস আমদানিতে আগে মাসে ব্যয় হতো প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। এখন লাগছে ৪০ কোটি ডলার।

এ ছাড়া অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানির এলসি খুলতেও ডলারের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। ফলে ডলারের সরবরাহ কমলেও চাহিদা কমেনি, যার প্রভাব পড়েছে বিনিময় হারে। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত দেড় মাসের ব্যবধানে ডলারের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। মে মাসে যে ডলার বাজারে ১২২ টাকা ৪৫ পয়সায় বিনিময় হয়েছে তা এখন প্রায় ১২৪ টাকা। সরকারিভাবে ডলারের দর বাড়ানো হয়নি; কিন্তু বাজারে লেনদেন এই হারেই হচ্ছে।

এর সাথে যোগ হয়েছে প্রবাসী আয়ে ঘাটতি। আগে প্রবাসী আয় আসত ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। গত ছয় মাস ধরে এই হারে এসেছে; কিন্তু গত জুলাইয়ে এসেছে ২৮৬ কোটি ডলার। রফতানি আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে ইউরোপে, বিশেষ করে তৈরী পোশাক আমদানি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কমেছে প্রবাসী আয়। কারণ বিদেশে শ্রমিক পাঠানো কমে গেছে। যারা কর্মরত আছেন তারাও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে অনেকে কাজকর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার দ্রুত অবসান হবে এমন সম্ভাবনা কম।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সঙ্কট কতটা গভীর হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বৈশ্বিক সঙ্কট দেখা দিলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবেই। তাই রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। কেউ কেউ টাকার বিনিময় হার কিছুটা সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। কেউ বলছেন, বিনিময় হার দীর্ঘ সময় প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিকৃতি সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। দর নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে পারে। বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে উচ্চ মার্জিন আরোপ করলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

এই মুহূর্তে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এতে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সঙ্কট গভীর হতে পারে।

সরকার পরিস্থিতির যথাযথ অনুসরণ, বিশ্লেষণ করে সুচিন্তিত ও সতর্ক পদক্ষেপ নেবে— এটিই প্রত্যাশিত।