ম্যাচের হাফ সেঞ্চুরির অপেক্ষায় বিপ্লব

Printed Edition
khela-2
বাংলাদেশ হকি দলের গোলরক্ষক বিপ্লব কুজুর

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

‘এ এশিয়ান গেমসে আমি দেশকে সেরা ছয়ে রাখতে চাই। সে সাথে ক্যারিয়ারে ৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করতে চাই।’ পরশু চীনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে হকি স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন বিপ্লব কুজুর। বাংলাদেশ জাতীয় হকিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ এক নাম এ বিপ্লব কুজুর। পোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী। সে ২০২১ সাল থেকে আছেন জাতীয় দলে। এখন পর্যন্ত আর বাদ পড়েননি। নিয়মিতই পোস্টের নিচে দাঁড়াচ্ছেন প্যাড, স্টিক আর হেলমেট নিয়ে।

বাংলাদেশে নানান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। দেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সাথে বাস করে ওঁরাও জনগোষ্ঠী। এ ওঁরাওদের কেউ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কেউবা খ্রিষ্টান। এ ওঁরাও জাতির হকি খেলোয়াড় বিপ্লব কুজুর। বিপ্লবরা হকি পরিবারের সন্তান। তার এক দূরসম্পর্কের ভাই ধীমান মিঞ্জি বিকেএসপিতে খেলেছেন। মামাতো ভাই তরুণ ওঁরাও দিলকুশায় এবং ভাগ্নে জয় কুজুর ভিক্টোরিয়ার হয়ে মাঠে নামেন। তবে বিপ্লব হয়েছেন গোলরক্ষক। জানান, আমাকে গোলরক্ষক বানিয়েছেন দিনাজপুরের মতি ভাই। তিনিই আমাকে হকিতে নিয়ে আসেন। খেলতাম ক্রিকেট। কিন্তু মতি ভাই আমার উচ্চতা দেখে বললেন, আমি হকি খেললে এবং গোলরক্ষক হলে ভালো করবো। এরপর তিনিই আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করান। সে থেকেই আমি হকিতে।

২০১২ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া বিপ্লব কুজুর ২০১৮ সালে শেষ করেন এ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পর্ব। এরপর চাকরি নিয়েছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে। এ সার্ভিসেস দলে তিনি ল্যান্স করপোরাল হিসেবে আছেন। এক ভাই এক বোন তারা। বাবা মারা গেছেন। ফলে সংসার চালানোর পুরো দায়িত্বই এখন বিপ্লবের কাঁধে।

২০২১ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দিয়ে জাতীয় দলে যাত্রা শুরু এ গোলরক্ষকের। সে আসরে শক্তশালী দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বাংলাদেশ ২-৩ গোলে হারে। বিপ্লবের মতে, ‘সেই ম্যাচে আমরা দারুণ লড়াই করেছিলাম। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরেছিলাম ২-৫ গোলে।’ দীর্ঘদেহী এ কিপারের আন্তর্জাতিক আসরে স্মরণীয় ম্যাচ ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ার মাঠে এএইচএফ কাপে। সে ম্যাচে তিনি ওমানের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকার ঠেকিয়ে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছিলেন। ৬০ মিনিটের খেলা ১-১ এ শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ওমানের চতুর্থ শট রুখে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর চতুর্থ হিটে নাঈম উদ্দিন ও পঞ্চম হিটে পুস্কর খীসা মিমো শেষ হিটে গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করান।

ঢাকার হকিতে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে যাত্রা শুরু বিপ্লবের। এরপর মেরিনার ইয়াংস ও আবাহনীতে খেলেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের পর আর প্রিমিয়ার হকি লিগ মাঠে গড়ায়নি। ফলে সর্বশেষ ঢাকা আবাহনীতে খেলাই বিপ্লবের শেষ লিগ ম্যাচ। ঘরোয়া হকিতে তার সেরা ম্যাচ দু’টি। তখন ছিলেন মেরিনার্সে। শেষ দুই ম্যাচে আবাহনী ও মোহামেডানের বিপক্ষে জিতেছিল মেরিনার্স। এতে প্রথম লিগ শিরোপা জয়ও হয় তাদের। বিপ্লব জানান, ‘আবাহনীর সাথে শেষ তিন মিনিটে আমরা দুই গোল খেলেও ম্যাচটি জিতেছিলাম। এরপর মোহামেডানের বিপক্ষে জয়। দুই ম্যাচেই দুর্দান্ত ছিল আমার পারফরম্যান্স।’

এবারের এশিয়ান গেমসটি বিপ্লবের জন্য প্রথম এশিয়াড নয়। ২০২৩ সালে চীনের হ্যাংজুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের বাংলাদেশ দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন তিনি। সে আসরে বাংলাদেশ সেরা ছয়ে থাকতে পারেনি। হয়েছিল অষ্টম। বিপ্লবের মতে, ‘আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দুভার্গ্যজনকভাবে অষ্টম স্থান পেতে হয়েছিল।’ তবে এবার পুরো হকি দলের মতো এ কিপারেরও টার্গেট দলকে সেরা ছয়ে রাখা। জানান, ‘আমাদের এবারের প্রাণপণ চেষ্টা থাকবে দলকে ন্যূনতম ৬ষ্ঠ স্থান পাইয়ে দেয়া। তাহলে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিসহ অন্য আরো আসর খেলতে পারবো। কোয়ালিফাইং রাউন্ড খেলতে হবে না।’ সে সাথে আমার লক্ষ্য এশিয়ান গেমসের মাধ্যমেই ৫০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা।

বিপ্লব কুজুরই ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রথম খেলোয়াড় যিনি হকি জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করছেন। অবশ্য ফুটবলে জোগেন লাকড়া বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে ছিলেন। বিপ্লব জানান, এখন আমাদের ওঁরাও সম্প্রদায়ের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আরো অনেক খেলোয়াড় উঠে আসছে। সবার তথ্য অবশ্য আমার জানা নাই।

দেশে অসীম গোপ ও নিপ্পন হলের বিপ্লবের আদর্শ গোলরক্ষক। এদের দেখেই আজ হকিতে প্রতিষ্ঠিত। আর ফরোয়ার্ড লাইনে তার প্রিয় এ মুহূর্তে বাংলাদেশের হকির বড় তারকা রাসেল মাহমুদ জিমি। সাথে পুস্কর খীসা মিমোও।