সাবেক ডিআইজি হায়দারের স্মৃতিচারণ
খালেদা কারাগারে ও হাসিনা বাইরে বৈঠক করেছিলেন
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
কারাবন্দী অবস্থায় থাকার পরও বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা কারাগারে ও কারাগারের বাইরে ভিন্ন দুইটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। এই দুই নেত্রীর এমন ধরনের বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার বারি বিশেষ ব্যবস্থাপনায়। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে জামায়াত নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে অংশ নেন। শেখ হাসিনা কারাগারের বাইরে বৈঠকে অংশ নেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমদের সাথে।
চিলি ফ্লেক্স স্টুডিওর পডকাস্টে এক দীর্ঘ স্মৃতিচারণ বক্তব্যে এমন কথা জানিয়েছেন সাবেক ডিআইজি মেজর (অব:) শামসুল হায়দার চৌধুরী। কারাগার অধিদফতরের সাবেক এই ডিআইজি প্রিজন্স ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরে কারাবন্দীদের নানা বিষয় নিয়ে তার কর্মকালে গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য ও মতামত দিয়ে আলোচিত ছিলেন। তিন বছর সাত মাস সময় কারা বিভাগে বন্দীদের সেবা ও কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ক্ষেত্রে তার অবদান বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়।
কারাগারের বাইরে বৈঠকের ব্যাপারে হায়দার বলেন, ডিজিএফআই এর একজন অফিসার পরচুলা পরে একদিন এলেন। আমি তাকে ঠিকই চিনেছিলাম। উনি ব্রিগেডিয়ার আমিন। আমাকে বললেন, হায়দার উনি (শেখ হাসিনা) আমাদের সাথে যাবেন এটা সেনাপ্রধান জানেন, তোমার আইজিপি উনিও জানেন, তুমি কি যাবে। আমি বললাম এটা পুরা আইনবিরুদ্ধ। উনি শেখ হাসিনাকে নিয়ে কোথায় গেলেন তখন জানতে পারিনি, রিসেন্টলি পত্রিকায় দেখলাম বসুন্ধরা এলাকার কোনো এক জায়গায় হাসিনা সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠক করেছেন। ১৯৭৫ সালে জেলখানায় যখন হত্যাকাণ্ড হয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষ কিন্তু তখন ঢুকতে দিতে রাজি হয় নাই। যখন প্রেসিডেন্ট মুশতাক নিজে টেলিফোন করেন তখন কারা কর্তৃপক্ষের করার আর কিছু থাকে না।
জেলখানায় থাকা অবস্থায় জামায়াত নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ সাহেবের সাথে একট বৈঠকে অংশ নেন বেগম খালেদা জিয়া। বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন ব্রিগেডিয়ার বারি। ওনারা তিনজনে মিটিং করলেন। নিজামী ও মুজাহিদ স্যার বেগম খালেদা জিয়াকে খুব সম্মান করতেন। খালেদা জিয়াও বৈঠকের পর তাদের কিছু খাওয়াতে চেয়েছিলেন। আমাকে বললেন, কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না। কিন্তু মুজাহিদ সাহেব বললেন না থাক, খাওয়ার দরকার নাই, ওনারা চলে গেলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শিতা সম্পর্কে মেজর হায়দার ১৯৭১ সালের একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, যখন অষ্টম বেঙ্গলের সিও জানজুয়া বাঙালি সেনাদের অস্ত্র জমা দিতে বলেন, তখন বাচ্চা কোলে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন যে “যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের স্যাররা (অফিসাররা) না আসে, ততক্ষণ কেউ অস্ত্র জমা দিবেন না।” তখন উনি যেভাবেই হোক যে এই যে আদেশটা দিলেন এই এক কথাতেই তো উনার দেশপ্রেম বা দূরদর্শিতা বুঝা যায়।
হায়দার বলেন, বেগম জিয়াকেও একবার জিজ্ঞেস করলাম আপনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আপনি ডিজিএফআই, এনএসআই’এর তথ্য ও সবার তথ্য পান, তো আপনার ছেলে সম্পর্কে যে নানা তথ্য আসে এগুলো আপনি পাননি? উনি বললেন ডিআইজি সাহেব, আমার ছেলে কি ভালো কাজ একটাও করে নাই? এটা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ছোট করার জন্য, ধ্বংস করার জন্য যা সে করে নাই, এমন কথা বেশি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা হয়। জেলখানায় খালেদা জিয়া অত্যন্ত পরিমিত খাবার খেতেন এবং প্রায় সারারাত নামাজ পড়তেন। পেঁপেটা বেশি পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে গোপনে কলাবাগানের একটা মিষ্টির দোকান থেকে ওনাকে মিষ্টি এনে খাওয়ানো হতো। তিনি প্রায়ই শেখ হাসিনার চিকিৎসার খোঁজ নিতেন এবং তার প্রতি সহমর্মিতা দেখাতেন। তার ছেলেদের (তারেক রহমান ও কোকো) জন্য চিঠিতে সাহস জোগাতেন।
শেখ হাসিনার কারাজীবনের স্মৃতি উল্লেখ করে মেজর হায়দার জানান, শেখ হাসিনা বন্দীদের খুব সহজেই আপন করে নিতে পারতেন এবং তাকে প্রায়ই নিজের খাবার থেকে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াতেন। গরুর গোশত খুব ভালো রান্না করতেন শেখ হাসিনা। সংসদ এলাকায় সাব-জেলে তার খাটটি পুরনো হওয়ায় ডিআইজি হায়দার ইমারজেন্সি হিসেবে খাটের নিচে ইট দিয়ে সাপোর্ট দিয়েছিলেন, যা নিয়ে পরে শেখ হাসিনা তার বইয়ে ‘ভাঙ্গা খাট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। শেখ হাসিনাও জেলে নিয়মিত নামাজ ও কুরআন শরিফ পড়তেন।
কারাগারে থাকাকালীন দুই নেত্রীর আচার-আচরণ সম্পর্কে হায়দার অনেক তথ্য দিয়েছেন। শেখ হাসিন সাব-জেলে থাকার সময় বন্দীদের সাথে অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার করতেন এবং অনেক সময় ডিআইজিকে মেহমান হিসেবে আপ্যায়ন করতেন। তিনি কারাগারের খাবার এবং নিজের পছন্দের খাবার নিয়েও কথা বলতেন। মেজর হায়দার তার জন্য নিরাপত্তার খাতিরে কিছু আইন বহির্ভূত সুযোগও দিয়েছিলেন। চোখ ও কানের চিকিৎসার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে যাওয়ার সময় সিকিউরিটির জন্য সামনের কালো গ্লাস দিয়ে ঢাকা গাড়ি থাকত এবং পেছনের গাড়িতে থাকতেন হাসিনা। সাংবাদিকরা মনে করত প্রথম গাড়িতেই হাসিনা রয়েছেন এবং তারা ওই গাড়িটির ছবি তুলতেন। পেছনের গাড়িতে হাসিনা ও ডিআইজি হায়দার ছিলেন। এ সময় হায়দারের ফোন হাসিনা ব্যবহার করতে চাইলে তা আইনের বরখেলাপ বলে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। এ সময় হাসিনা ডিআইজিকে বলেন, সাংবাদিকরা সামনের গাড়িটির ছবি তুলছে তুলুক। আমরা চলেন ঢাকা শহর একটু ঘুরে আসি।
পেশাগত কাজের ফাঁকে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে দুই নেত্রীকে অনেক বিষয়ে প্রশ্ন করতেন মেজর হায়দার। ওয়ান ইলেভেনের পর প্রথমে কারাগারে নেয়া হয় হাসিনাকে। তার জন্যে পিডবলিউডি যে খাট পাঠায় সেটির দুই-একটা পাটাতন হুট করে পড়ে যায়, ইমারজেন্সি ঠিক করার জন্য পাটাতনের নিচে কয়েকটি ইট দিয়ে রাখা হয়। হায়দার বলেন, উনি কিন্তু মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পারতেন। ওই মুহূর্তে আমি ছাড়া তার কাছে যেয়ে কথা বলার কেউ ছিল না। উনি আমাকে দেখে বলতেন আসেন আসেন আমার মেহমান আসছেন। তিনি বলেন, উনারা যতটা ভালো থাকবেন সেটাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। উনি থাকতেই পাশের বাসাটা পরিষ্কার করতে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ব্যাপারটা কী? আমি বললাম বেগম খালেদা জিয়া আসবেন। হাসিনা বললেন, তারে যে নতুন ঘরে দিলেন। আমি বললাম, আপনি তো কোনো সময় না দিয়ে হুট করে আগেই চলে আসছেন। তখন হাসিনা বললেন, আমি কিন্তু যাওয়ার সময় উনার সাথে দেখা করে যাব। আমি বললাম, আপনাদের মধ্যে যদি ভালো সুসম্পর্ক থাকত খাতির থাকত তাহলে তো এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। আপনারা তো কেউ কারো মুখ দেখতে পারেন নাই। আপনারা কেন মিলেমিশে থাকলেন না? শেখ হাসিনা বললেন, দেখেন না সংসদে আমাদের কিরম বকাঝকা করে।
খালেদা জিয়াকেও একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, না ডিআইজি সাহেব আমি কিন্তু অনেক চেষ্টা করেছি, আমি আমার ছেলের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছি, উনাকে রিসিভ করে এনেছি, উনারা তো আবার অন্যজনের কথা ছাড়া নড়েন না।
খালেদা জিয়ার মা যখন মারা গেলেন তখন প্যারোলে ওনাকে মায়ের লাশ দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। আনঅফিশিয়ালি আদেশ ছিল যে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত কোকো তিনজনই দেখা করতে যাবে কিন্তু কারো সাথে কারো যেন দেখা না হয়। সেদিন কঞ্জুস নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। এদিকে বেগম জিয়া বলেছিলেন, আপনারা যদি আমারে এখন না পাঠান আমি হেঁটে রওনা দিব। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসলাম। তারেক রহমান ও কোকো পৃথকভাবে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যাওয়ার পর ফিরে এলে বেগম জিয়াকে নিয়ে গেলাম। মায়ের লাশ দেখার পর প্যারোলে মুক্তির একটি নির্দিষ্ট সময় থাকার কারণে অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পর আমি খবর পাঠালাম যে ম্যাডামকে বলেন উনি তাড়াতাড়ি চলে আসুক, অনেক সময় হয়ে গেছে। উনি আমার কথা শোনার পরেই দেরি না করে চলে এলেন। কিন্তু পরে জানলাম ওই মুহূর্তে ম্যাডাম খালেদা জিয়া খেতে বসতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বিলম্ব হবে বলে জেল কর্তৃপক্ষকে বিপদে ফেলার দরকার নাই, ওইখানে জেলে যা আছে আমরা ওইটাই খেয়ে নেব বলে উনি চলে এসেছিলেন। এটা জেনে পুরো জেল কর্তৃপক্ষই আফসোস করেছে কারণ খাওয়ার টেবিল থেকে কাউকে সাধারণত এভাবে উঠায় আনা হয় না। উনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারপরেও উনি আইনের বাইরে একবারও যান নাই।
হায়দার জানান, হাসিনা একবার আমাকে বললেন, কারারক্ষীদের উনি পড়ালেখা করাচ্ছেন। বললাম এটা সাংবাদিকরা জানতে পারলে লিখবে যে আপনি কারাগারে শিক্ষকতা করছেন। উনি বললেন, বললে বলুক। আমিতো ওদের নামাজও পড়াই। আমি বললাম সাংবাদিকরা জানলে পত্রিকায় লিখবেন কারাগারে আপনি ইমামতিও করাচ্ছেন।
কারাগারে ব্যবহারের জন্যে কম্পিউটার চাইলে বললাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার জানতে চাইবেন কেনো কম্পিউটার চান, এটা শুনে তিনি বলেছিলেন থাক তাহলে। উনি আর আবেদন করেননি। অনেক সময় আমার হাতে টেলিফোনটা নিতে চাইতেন কথা বলার জন্য। আমি বারবার বলতাম যে আপনারাই তো নিয়ম করেছেন যে টেলিফোনে কথা বলা নিষেধ। তবে পরে আমি শুনেছি যে ব্রিগেডিয়ার বারি বা ব্রিগেডিয়ার আমিন, উনারা যখন দেখা করতেন তারা টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ করে দিতেন ওনাকে। ওনারা জেলে থাকার সময় পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো মারা গেলে আমরা দু’টি জেলেই কলাপসবল গেট দিয়ে দেই। শেখ হাসিনা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আপনারা যে এই গেট লাগাচ্ছেন, আর্মি যদি আসে ফিরাতে পারবেন। আমি বললাম, সিকিউরিটি ডিউটি করি, এটলিস্ট আমাদের না মেরে কেউ উপরে উঠতে পারবে না। আমরা বেঈমান না। হাসিনা বললেন, বেনজির ভুট্টোর সাথে ওনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল এবং দেশে তিনি ফিরে আসছেন শুনে বেনজির ভুট্টোও পাকিস্তানে ফেরার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
হায়দার বলেন, শেখ হাসিনা ছোট মাছ খেতেন। বেশি খাওয়া-দাওয়া করতেন না। শুনতাম যে উনি নাকি খুব ভালো গরুর গোশত রান্না করতেন। তাই আমি মাঝে মাঝে বলতাম কই ম্যাডাম, আপনি তো গরুর গোশত রান্না করে খাওয়াইলেন না। উনি বললেন, আপনি তো আমারে রান্না করতে দেন না। রান্না করতে কোনো একটা বিপদ হলে তখন তো আমি নিজেই মরব বলে আপনাকে রান্না করতে দেই না। যেদিন উনি জেল থেকে চলে যাবেন, সেদিন উনি গরুর গোশত রান্না করে আমাকে খাইয়েছিলেন। তখন আমি বললাম যে আপনি তো চলে যাবেন, জেলখানার ইম্পরটেন্স তো কমে যাবে। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আপনি কি চান আমি সারা বছর জেলেই থাকি। খুব সহজে কথা দিয়ে উনি মানুষকে আপন করে নিতে জানতেন। ওনাকে বলেছিলাম, নিজেকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেন, দীর্ঘদিন রাজনীতি করছেন, আপনার বাসায় এত এত ডেগ চা রান্না করা হতো, টোস্ট বিস্কুট নিয়ে লোক আসত। তো এতদিন সভাপতি থাকার পরও আপনার দলে ৩০০ ভালো লোক পান না যারা চোর না, ভালো লোকরে তো মানুষ এমনিই ভোট দেয়। উনি বললেন, ডিআইজি সাহেব আমার দল বিএনপির মতো বা বোয়াল মাছের মতো এত হা করে খায় না। একটু কম খায়। একদিন উনি আমাকে বললেন যে, ডিজি সাহেব ইচ্ছা করলেই আমি সবকিছু করতে পারি না। তখন বললাম, ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদ সকালবেলা গলফ খেলার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল মাহমুদুল হাসানকে বলেছিলেন, ‘হাসান, এমন দেশের প্রেসিডেন্ট হইলাম যে আমার নিজের সিদ্ধান্ত আমি নিজে নিতে পারি না।’ ১৭ বছর পরে শেখ হাসিনা একই কথা বললেন। হাসিনাকে বলেছিলাম, আপনি ইন্ডিয়া ও আমেরিকাকে তেল গ্যাস দেননি, বিএনপি তা দিতে রাজি হয়েছিল যে জন্য নেক্সট ইলেকশনে কেউ কল্পনা না করলেও বিএনপি জিতে যায়। বিএনপি জিতার পরেও কিন্তু তেল-গ্যাস দেয় নাই। তখন ইন্ডিয়া আর আমেরিকা বুঝছে যে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় এমন কোনো দলকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া যাবে না এবং এরই ফলে ওয়ান-ইলেভেন হয়েছে। দুই বছর তারা থাকছে। এখন আপনারা ভেতরে ভেতরে কী করছেন আপনারাই জানেন। হাসিনা আমার কাছে জানতে চান আপনাকে এই কথা কে বলেছে? আমি বলিনি। বেগম জিয়াকেও একই প্রশ্ন করলে তিনিও জানতে চান কে একথা বলেছে? আমি বলিনি। পরে হাসিনা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তেল-গ্যাস দিতে চাননি বলে তাকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হয়নি।
হায়দার জানান, খালেদা জিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি জেনারেল মঈনকে সেনাপ্রধান কেন বানালেন? উনি বললেন, দেখেন, আমার দোষ কী? আপনাদের ডিজিএফআই তো আমার কাছে এই নামটা দিয়ে গেছে। জেনারেল মঈন প্রেসিডেন্ট হলে আপনার কোনো আপত্তি আছে জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বললেন, উনাকে তো সেনাপ্রধান আমিই বানিয়েছি, উনি যদি দেশের জন্য ভালো কাজ করেন আমার কোনো আপত্তি নাই। একই প্রশ্ন শেখ হাসিনাকে করলে তিনি বলেছিলেন, এটা কি এতই সহজ। উনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে দেখেন নাই। ইলেকশন করে আসতে বলেন। পরে উনিই কিন্তু রাতে যেয়ে জেনারেল মঈনের সাথে দেখা করলেন এবং পরবর্তী ঘটনা আপনারা জানেন। হয়তো এটাই রাজনীতি, বলবে একটা; করবে আরেকটা। জেলখানা থেকে বের হয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর উনার সাথে যখন সেনাকুঞ্জে দেখা হতো তখন জানতে চাইতেন আপনি কি আমার চিঠিগুলো ফেরত দিছেন নাকি দুই-একটা চিঠি এখনো রেখে দিয়েছেন। জেলখানায় হলেও কেউ যদি কোনো চিঠি দেয় তাতে যদি আপত্তিকর কোনো কথা লেখা থাকে, যেটা রাষ্ট্রের জন্য সমাজের জন্য কোনো ব্যক্তির জন্য হুমকি স্বরূপ বা ক্ষতিকর তখন ওইটা কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।
হায়দার বলেন, শেখ রেহানাকে উনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং শেখ রেহানার জন্য উনি অনেক কান্নাকাটিও করতেন। বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনা জেলে নামাজ পড়তেন। কুরআন শরিফ খতম করতেন। আমি দুইজনকেই বলেছি, আপনারা যদি বেহেশতে কোনোদিন যান জেলখানার কারণে যাবেন। এত পুণ্য করার সময় বাইরে গেলে আর পাবেন না। খালেদা জিয়াও সারারাত নামাজ পড়তেন এবং ভোরে ঘুমাতেন। দলের লোকেরা বিভিন্ন দোয়া দরুদ লেমিনেটেড করে দিলে আমি ওনাদেরকে দিতাম। উনারা তা পড়তেন। শেখ হাসিনা যখন শুনলেন যে মা মারা যাওয়ার পরও বেগম খালেদা ও তার দুই পুত্রের সাথে দেখা হয়নি তখন বললেন, আপনারা তিনজনকে দেখা করার সুযোগ দিলেন না, হাজার হলে তো মা। আবার খালেদা জিয়া বলতেন, আচ্ছা এই যে পত্রিকায় দেখি সবসময় শেখ হাসিনার চোখের এত অসুখ, কানের অসুখ আপনি ভালোমতো ট্রিটমেন্ট করান না কেন?