নতুন বাজেটে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তার মধ্যে একটি বিতর্কিত উদ্যোগ হলো, গৃহায়ন খাতে প্রচ্ছন্নভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ।

আমাদের সম্পদ কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে গলদ আছে। যেমন, জমি বিক্রি হলো ৭০ লাখ টাকা, অথচ রেকর্ড হলো ৬০ লাখ টাকা। বাকি ১০ লাখ টাকার কর কিভাবে হবে। এরকম কিছু বিষয়ে বিদ্যমান বিধিবিধানে সমস্যা আছে। সে জন্য কারো কারো কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ থাকতে পারে। এটা হতেই পারে; কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে চলতি বাজেটে অপ্রদর্শিত টাকা প্রদর্শনের মোড়কে মূলত দুর্নীতিজাত অবৈধ আয় বৈধ করার বিশেষ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুটো বিষয় ঘটছে। এক. রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কর ছাড় দেয়া হচ্ছে। যাদের জন্য এবং যেভাবে এই ছাড় দেয়া তা ট্যাক্স জাস্টিসের পরিপন্থী। দুই. এর মধ্য দিয়ে নিয়মিত কর দেয়া সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, প্রকারান্তরে শাস্তি দেয়া হচ্ছে । কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং সবাইকে করের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এটি একটি অনৈতিক পন্থা যা কাম্য নয়। সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ এটি একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেখানে যদি দেখা যায় অবৈধ অর্থ উপার্জনে বাধা দেয়া হচ্ছে না, কর ছাড় দিয়ে আরো বলা হচ্ছে কিভাবে অর্থ উপার্জন করেছে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। এটি সংবিধান নির্দেশিত রাষ্ট্রের দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক।

অনৈতিক পন্থায় কর হার হ্রাস বা ছাড় দেয়ার সাথে কর অবকাশ বা অব্যাহতি এবং কর রেয়াত-এর সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। কোনো একটি এলাকা বা শিল্প পিছিয়ে আছে সেটিকে এগিয়ে আনতে কর অবকাশ বা অব্যাহতি দেয়া হয়। এর একটি যুক্তি আছে। এতে একটি এলাকা বা উদীয়মান শিল্পের উন্নয়ন হবে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে কর ধরলে তার উন্নতি ব্যাহত হতে পারে। সে জন্য সব দেশেই ট্যাক্স হলিডের বিধান আছে। আমাদের দেশে এটাও ছিল বা কোনো ক্ষেত্রে এখনো আছে। আর কর রেয়াত বা প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রথম কর আদায় করা হয়, পরে শিল্পের বা সেবার স্বার্থে ফেরত দেয়া হয়। এটাকে কর প্রত্যর্পন বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর ভর্তুকি দেয়ার নজিরও আছে। রাষ্ট্র যদি মনে করে যে কোনো খাত ভালো কাজ করছে। যেমন কৃষি খাতে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়া হয়। কেন ভর্তুকি দেয়া হয়? তাদের সমর্থ করে তোলার জন্য। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, একজন লোকের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ অপ্রদর্শিত অর্থ (অপ্রদর্শিত অর্থের আড়ালে দুর্নীতিজাত কালো টাকা) ঘোষিত সুযোগে কম হারে কর দিয়ে বৈধ করতে পারছে। অর্থাৎ অন্য ব্যক্তি বা কোম্পানি করদাতা যেখানে ২৫-৩০ শতাংশ কর দিচ্ছে, সেখানে কালো টাকার মালিক দিচ্ছে কমানো কর। এটি একটি বড় ধরনের কর প্রণোদনা। আবার বলা হচ্ছে, কালো টাকার উৎস নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না অর্থাৎ দুর্নীতিবাজকে রাষ্ট্র সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বরং ইমিউনিটি দিচ্ছে।

রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা ফোর ‘আর’ এর কথা বলি। এক রেভিনিউ আর্নিংস, দুই. রিডিস্ট্রিবিউশন, সমাজে যাতে সম্পদ কারো কাছে কুক্ষিগত না হয়। তিন. রিপ্রাইসিং। কোনো পণ্যের দাম কর দেয়ার পর একধরনের হয়, আবার কর না দিয়ে নিলে আরেক ধরনের হয়। অর্থাৎ কর নেয়ার মাধ্যমে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চার. রিপ্রেজেন্টেশন। রাষ্ট্রকে কর দেয়া নাগরিকের দায়িত্ব। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের জবাবহিদি চাইতে পারে নাগরিক। যদি করই না দেয়া হয়, দুর্বল রিপ্রেজেনটেশনে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার তার থাকে না । নিজে কর না দিয়ে সে রাষ্ট্রের কাছে সেবা চাইছে। কর দিলে বাজেট বরাদ্দ পাওয়া তার অধিকার, কর না দিয়ে সে সরকারের কাছে অনুনয় বিনয় করে, সরকার তার এই দুর্বলতা জানে বলে দয়া দাক্ষিণ্য হিসেবে কিছু সেবা দেয়, তার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে এবং রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাতের সুযোগ পায় বা প্রলুব্ধ হয়। সে কর দেয় না বা ফাঁকি দেয় বা দিতে চায় বলেই কর অফিসের লোকেরা তাকে চেপে ধরে, ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে ব্যাপৃত হয়। ফাঁকিবাজ করদাতা তার সাথে আঁতাত করে রাষ্ট্রের কর স্বার্থ ফাঁকি তো দেয় এবং কর বিভাগের অন্যায় হয়রানি বা ভয় প্রদর্শনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না।

এসব বিষয় দেখার জন্য, সাধারণ করদাতার অভিযোগ জানানোর জন্য, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় অনেক কিছু করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছিল, থাকা উচিত ছিল সেটি হলো ট্যাক্স ওমবুডসম্যান অফিস। ১৬৬টি দেশে আছেও। ২০০৫ সালে এ অফিস যে উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তা অর্জনের সুযোগ না দিয়ে ২০১১ সালে এসে পুরো অফিসটাই বিলোপ করা হয়। ২০০৫ সালে কর ন্যায়পাল অফিস গঠনের সময় বলা হয়েছিল, এখানে মানুষ করসংক্রান্ত হয়রানি ও বিরোধের বিচার পাবে। মাত্র ছয় বছরের মাথায় ২০১১ সালে বলা হলো, করদাতার সাথে ভালো আচরণ করলে, সেবা দিলে, ন্যায় বিচার করলে, কর দেয়ার পদ্ধতি সহজ করলে এ অফিস লাগবে কেন। আরো বলা হলো কর আইন, শুল্ক ও ভ্যাট আইনের মধ্যে কর ন্যায়পালের প্রভিশন নেই, তাই সেটিকে বিলোপ করতে হবে। ন্যায়পাল অফিস কর আইনের সাথে সংযুক্ত না হলে সংযুক্ত করে নিতে হবে। না থাকলে আইন সংশোধন করে নিতে হবে। আইন করেই তো কর ন্যায়পাল অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এখানে প্রশ্ন হলো, কর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করলে কর আহরণে উন্নতি আসবে না। কর-জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ যে তলানিতে, তার কারণটাই হলো এভাবে এ সমাজে কর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। মানে কাউকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না, বলে এমনটিই হচ্ছে। অপ্রদর্শিত অর্থ এবং দুর্নীতিজাত অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু বিশেষ হ্রাসকৃত হারে কর দিয়ে এবং উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, যেটি গুরুতরভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। কিভাবে উপার্জিত হলো, কিভাবে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন করা না গেলে তো সম্পদ পুনর্বণ্টনের কাজ কঠিন হবে। অর্থাৎ বৈষম্য উসকে দেয়া হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে সম্পদের একটা বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। হু হু করে জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক পরিমাণ বেড়েছে এবং সেভাবে পারক্যাপিটা জিডিপিও বেড়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতায় ‘গরুর হিসাব শুধু কাজীর খাতায়, গোয়ালে তেমন গরু নেই’ পরিস্থিতি। ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খুব দ্রত ধনীর সংখ্যা বাড়ছে।

আগের বানানো বাড়ি বা কেনা জমির ওপর যদি সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়, এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে অর্থনীতির কোনো লাভ হচ্ছে না। শ্রমনিয়োজনসহ সবকিছু আগেই হয়ে গেছে। এখন তো কোনো কিছু হচ্ছে না। এখন শুধু হ্রাসকৃত হারে করটা নেয়া হচ্ছে। এতেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হলো, হ্রাসকৃত হারে কর দেয়া সাপেক্ষে কোনো প্রশ্ন না করে যদি সুযোগটা দেয়া হয়, তাহলে তারা আবাসন খাতে প্রভাব বিস্তার করবে। ধরা যাক, ৫০ লাখ টাকার জমিকে সে ৬০ লাখ টাকায় নিয়ে যাবে বা দেখাবে । কেননা তাদের তো উচ্চহারে কর দিতে হবে না এবং উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। ফলে আবাসন খাতেও একটা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হবে। একটা বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি হবে। এতে সৎ করদাতা, সৎ ক্রেতার জন্য অসুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সুতরাং এমন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে; যেখানে উপকার তো হবেই না; বরং বাজার বিকৃতি ঘটাবে।

রাষ্ট্র যদি মনে করে কালো টাকা অর্থনীতিতে উপকারে আসুক তাহলে এমন সুযোগ দেয়া যেতে পারে, হাওর বা উপকূলীয় বাঁধ বা বড় অবকাঠামো প্রকল্প অর্থের অভাবে মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়েছে, হাসপাতালে শয্যা কম। বিদ্যমান বরাদ্দ ও সরকারি প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে করা যাচ্ছে না, জনসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কিংবা শ্রমঘন কুটির শিল্প উদ্যোগ গ্রহণে প্রযোজ্য কর দিয়ে সাদা করা টাকা বিনিয়োগের আহ্বান জানানো যায় । এসব জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করলে সরকার একটা উৎসাহব্যঞ্জক প্রণোদনা বা কর প্রত্যর্পণ ঘোষণা করবে। এর ফলে উন্নয়নে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণও বাড়বে, বিনিয়োগের একটা সুযোগও তৈরি হবে। বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় প্রকল্পে যে দুর্নীতি হয় তা যদি প্রণোদনা আকারে দিয়ে দেয়া হয় তাতেও লাভ। সুতরাং এ ধরনের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করে কালো টাকা অর্থনীতির ধারায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি ও রেমিট্যান্স-প্রবাহ ক্রমেই বেড়ে চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এটা খতিয়ে দেখা বা বিশ্লেষণ করা উচিত যে, এটা কি আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো টাকা, নাকি অন্য কিছু। নিশ্চয়ই না। প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে এত টাকা থাকার কথা নয়। তারা শুধু পাঠাচ্ছেনই। তা কেবল বেড়েই চলছে। ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করলে বিষয়টি বোঝা যাবে। অনেক ব্যবসায়ী, যারা হুন্ডির মাধ্যমে বাইরে ব্যবসা করত, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তাদের অনেকেই পুঁজিও পাঠিয়েছে। এটাকেও হয়তো রেমিট্যান্স বলা হচ্ছে। তারপর কালো টাকাও কোনো একটা উৎসবকে কেন্দ্র করে পাঠানো হয়েছে। সে জন্য রিজার্ভ বেড়ে থাকতে পারে। রিজার্ভ তো অর্থনীতির আয়, পুরোটা সরকারের আয় বা সম্পদ নয়, এটি দেশের বহির্বাণিজ্যের ক্রেডিট অর্ডিনেন্স, কনফিডেন্স বাড়ায়। এ টাকাটা তো পরের টাকা। এ টাকা ব্যাংকে অলস হয়ে পড়ে থাকলে অর্থনীতির বাড়তি কোনো লাভ নেই; বরং ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ বিদেশে ব্যবহার করতে না পারায় ওই অর্থ তারা দেশে পাঠিয়েছে। তাতে স্ফীত হচ্ছে রিজার্ভ। ক্ষেত্রবিশেষে রক্ষণশীল নীতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিজস্ব অর্থনীতিগুলো কয়েক বছরের মধ্যে পুনরুদ্ধার করতে গেলে এমনটিই করতে হবে। এর বিকল্প নেই। সব দেশেই ‘চাচা আপন বাঁচা’ নীতি গ্রহণ করছে, করবে। সে ক্ষেত্রে এই কালো টাকা বিদেশে পাচারের পথ নেই। দেশেও কোনো বিনিয়োগ পরিবেশ বা সুযোগ নেই।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জাপানে বাংলাদেশের প্রাক্তন বাণিজ্য দূত