আজ কি হকি কন্যাদের নতুন সূর্যোদয়
জুনিয়র এশিয়া কাপ হকি
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
লড়াইটা হোক সাহসের, স্টিকটা উঠুক দৃঢ়তায়, আর শেষ বাঁশির পর পুরো বাংলাদেশ বলুক- হ্যাঁ, মেয়েরা পেরেছে!
একটা ম্যাচ। মাত্র ষাট মিনিটের লড়াই। অথচ এই ছোট্ট সময়ের ভেতরই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নারী হকির সবচেয়ে বড় এক স্বপ্নের দরজা। আজ জিতলেই জুনিয়র এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে উঠে যাবে বাংলাদেশের হকি কন্যারা। আর সেমিফাইনালের টিকিট মানেই-বিশ্বকাপের মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর স্বপ্নপূরণ! আজ যেন বাংলাদেশের হকির ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বপ্নের দরজা। সেই দরজার ওপাশে সেমিফাইনাল, আর সেমিফাইনালের হাত ধরেই বিশ্বকাপের রঙিন ঠিকানা! ভাবতেই শিহরণ জাগে-বাংলাদেশের হকির পুঁচকে মেয়েরা আজ বিশ্বমঞ্চে পা রাখার স্বপ্ন দেখছে। চ্যালেঞ্জার পুলে অপরাজিত থেকে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করায় এবার কোয়ার্টার ফাইনালে এলিট পুলের তৃতীয় দলকে মোকাবেলা করবে বাংলাদেশ। আজ বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটের সেই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জাপান। তবে জাপান হওয়ার সম্ভবনাই বেশি।
ভাবতেই যেন শরীরজুড়ে শিহরণ জাগে। যে মেয়েরা এক দিন হাতে গোনা কয়েকটি মাঠে, সীমিত সুযোগ আর অসংখ্য প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে হকিস্টিক হাতে নিয়েছিল, তারাই আজ দাঁড়িয়ে এশিয়ার সেরাদের কাতারে জায়গা করে নেয়ার দোরগোড়ায়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হংকং-চায়নাকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জানিয়েছে- বাংলাদেশ আর শুধু অংশ নিতে আসেনি, ইতিহাস লিখতেও এসেছে। অপরাজিত থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া সেই বার্তাকে আরো জোরালো করেছে। এর আগে চাইনিজ তাইপে, পাকিস্তান ও কাজাখস্তানকে টানা হারিয়েছিল বাংলাদেশ।
চার ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে মোট ২২ গোল করেছে তারা। বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি গোল, সেটিও পাকিস্তানের বিপক্ষে। চ্যালেঞ্জার পুলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। চার ম্যাচের চারটিতেই জিতে পূর্ণ ১২ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত থেকেই নারী জুনিয়র এশিয়া কাপ হকির কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লাল-সবুজের দল।
চ্যালেঞ্জার ও এলিট, দুই পুল মিলিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকাতেও দারুণ অবস্থানে বাংলাদেশের দুই খেলোয়াড়। ছয় গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন অধিনায়ক শারিকা রিমন। পাঁচ গোল নিয়ে তার পরেই আছেন বাংলাদেশের আইরিন রিয়া ও ভারতের পূর্ণিমা যাদব।
আজ তাই পুরো বাংলাদেশের চোখ থাকবে এই পুঁচকে মেয়েদের দিকে। তাদের দৌড়ের সাথে ছুটবে কোটি মানুষের স্বপ্ন, প্রতিটি গোলের সাথে কাঁপবে দেশের হৃদস্পন্দন। আর যদি আজ সেই কাক্সিক্ষত জয় আসে, তবে সেটি হবে শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়- বাংলাদেশের নারী হকির নতুন সূর্যোদয়।
হকিস্টিক হাতে ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলো আজ ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ছে। দরজাটা খুলতে আর মাত্র একটি জয়! পুরো বাংলাদেশ আজ তাকিয়ে থাকবে হকিস্টিক হাতে ছুটে চলা এই কিশোরীদের দিকে। তাদের ঘামে ভেজা জার্সিতে আজ কোটি মানুষের স্বপ্ন, তাদের প্রতিটি আক্রমণে হৃদস্পন্দন বাড়বে বাংলাদেশের। পুঁচকে মেয়েদের সামনে আজ ইতিহাস হাতছানি দিচ্ছে। তারা কি পারবে সেই হাতটি শক্ত করে ধরতে? দেশজুড়ে এখন একটাই অপেক্ষা- আরেকটি জয়ের, আরেকটি ইতিহাসের, আর বিশ্বকাপের দুয়ারে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর!
চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার হুলুনবুইর সিটিতে চ্যালেঞ্জার পুলের শেষ ম্যাচে গতকাল শুরু থেকেই হংকংয়ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে বাংলাদেশ। একতরফা ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে জোড়া গোল করেছেন আইরিন রিয়া ও মোছা: লিমা। একটি করে গোল করেছেন শারিকা রিমন ও কনা আক্তার।
ম্যাচের ৯ মিনিটেই পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে বাংলাদেশকে এগিয়ে দেন শারিকা। এরপর ১৯ মিনিটে ফিল্ড গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আইরিন রিয়া। ২৬ মিনিটে কোনা আক্তারের ফিল্ড গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধেও একই ছন্দ ধরে রাখে লাল-সবুজের মেয়েরা। ৩১ মিনিটে লিমার ফিল্ড গোলে স্কোরলাইন হয় ৪-০। মাত্র দুই মিনিট পরই নিজের দ্বিতীয় গোল করে বাংলাদেশের ব্যবধান আরও বাড়ান আইরিন রিয়া। এরপর ৪৮ মিনিটে লিমাও নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলে ৬-০ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত হয়।
হার পিছু ছাড়েনি যুবাদের
জুনিয়র এশিয়া কাপ হকিতে একই দিনে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ দলের দুই রকম অভিজ্ঞতা। চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ায় চলমান আসরে নারী দল হংকংকে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে শতভাগ জয় নিয়ে। অন্য দিকে পুরুষ অনূর্ধ্ব-২০ দল নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে ৩-০ গোলে হেরে গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে।
ম্যাচের শুরুতেই দুই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। নবম মিনিটে রানা ওয়ালিদের ফিল্ড গোলে এগিয়ে যায় পাকিস্তান। তিন মিনিট পর, আবারো গোল করেন তিনি। ফলে প্রথম কোয়ার্টার শেষেই ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ার্টারে নিজেদের রক্ষণ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের আক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি গোলের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করলেও কাক্সিক্ষত গোলের দেখা পায়নি তারা। বরং শেষ কোয়ার্টারে ৫২ মিনিটে মোস্তফা গুলামের ফিল্ড গোলে পাকিস্তানের ব্যবধান হয় ৩-০।
এর আগে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক চীনের কাছে ৩-২ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৪-২ গোলে হারার পর তৃতীয় ম্যাচে কাজাখস্তানকে ৪-২ গোলে হারিয়ে জয়ের দেখা পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হেরে আবারও পরাজয়ের স্বাদ পেল মওদুদুর রহমান শুভর দল। পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে আগামিকাল শুক্রবার জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামবে অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ দল। একই টুর্নামেন্টে তাই বাংলাদেশের দুই দলের পথ এখন দুই দিকে। নারী দল যেখানে টানা চার জয় নিয়ে বিশ্বকাপের দ্বারপ্রান্তে, পুরুষ দল সেখানে গ্রুপ পর্বের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে পরবর্তী ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নামবে।