বছর না যেতেই ভেঙে পড়েছে কুকরি মুকরির ক্যানোপির স্লাব
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর কুকরি মুকরি, ভোলা থেকে ফিরে
‘ভাই সাবধানে হাঁটবেন, একটু বেখেয়াল হলেই শ^াসমূলে হোঁচট খাবেন।’ ২০২২ সালে চর কুকরি মুকরির ডাকাইত্তার খাল পেরিয়ে বনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট নারিকেল বাগানের দিকে যাচ্ছিলাম। সে সময় এভাবে আমাকে সতর্ক করলেন উঠতি বয়সের ট্যুর গাইড রাশেদ হাওলাদার। তখন তাদের দাবি ছিল, সরকার যেন স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের জন্য বনের মধ্যে এই রাস্তাটি পাকা করে দেয়। স্থানীয়দের সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার একমাত্র পায়ে হাঁটা পথ এটি। গত বছর ঢাল চর, পূর্ব ঢাল চর এবং তারুয়ার চর হয়ে চর কুকরি মুকরি পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। আমাদের সাথে ছিলেন দুইজন নারী পর্যটক ও একটি ছোট বাচ্চা। তখন জাকির মাঝি অন্ধকারের মধ্যে কোনোভাবেই বনের ভেতর দুই কিলোমিটারের এই পথে নিতে চাইলেন না। কারণ রাতে আরো ভয়ঙ্কর ওই ৬-৭ ইঞ্চি লম্বা লম্বা কেওড়া ও গেওয়া গাছের শ^াসমূল গুলো। হোঁচট খেয়ে পড়লেই মারাত্মক আহত হওয়ার শঙ্কা। সাপের ভয়ও আছে। তখন অবশ্য ক্যানোপি নির্মাণের জন্য অ্যাংগেল, রড, সিমেন্ট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ছিল ওই মাটির রাস্তার ওপর। এতেই রাতে হাঁটাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। স্থানীয়রা অবশ্য রাতে অনায়াসেই এই রাস্তা পার হতেন।
তাই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য আমাদের খেয়াঘাটে ঘণ্টা খানেক বসিয়ে রাখা হলো। এরপর জোয়ারের পানিতে যখন বনের অন্য প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট খালটি ভরে গেল তখন ছোট নৌকায় করে আমাদের নিয়ে গেলেন সরকারি গেস্ট হাউজে। এতে অবশ্য নতুন একটি অভিজ্ঞতা হলো। রাতের অন্ধকারে টর্চ লাইট জ¦ালিয়ে বনের ভেতর সরু খাল ধরে ছোট নৌকায় এগিয়ে চলা। দুই ধারের বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল শিয়ালের ডাক। সাথে পাখির শব্দ। সাথে থাকা ছোট্ট মেয়েটি প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে মজাই করেছিল।
শেষ পর্যন্ত গত বছর শুরু হওয়া সেই ক্যানোপি নির্মাণের কাজ ক’দিন পরেই শেষ হয়। উদ্বোধন পর্বের পর প্রায় ১০ কোটি টাকার স্থাপনাটি ব্যবহার করা শুরু করেন স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকরা। তবে বছর না যেতেই ভেঙে পড়া শুরু হয়েছে সেই ৪-৫ ফুট উঁচু ক্যানোপির সিমেন্টের স্লাবগুলো। এবার এই কুকরি মুকরি হয়েই চর পাতিলা, মাঝের চর, চর নিজামে যাওয়ার সময় সেই ক্যানোপি পার হয়ে ট্রলারের ঘাটে গিয়েছি। তখনই চোখে পড়ল ধসে পড়া স্লাবগুলো। একটি দু’টি নয়, বেশ কয়েক জায়গায় এই স্লাবগুলো ভেঙে নিচে পড়ে গেছে। পর্যটকরা একটু অসতর্ক হলেই নিচে পড়ে যেতে পারেন। একটি জায়গায় দেখা গেল ১৫-২০টি স্লাব ভেঙে নিচে পড়ে গেছে। অন্য অংশে লাফিয়ে পার হওয়া গেলেও এই অংশ পার হতে হয় পাশে থাকা অ্যাংগেলে হাত রেখে এবং নিচের অ্যাংগেলে সাবধানে পা রেখে রেখে। এক জায়গায় দেখা গেল একটি স্লাবের ভাঙা শুরু হয়েছে। সেই ভাঙা অংশ দেখেই বুঝা গেল এগুলো নির্মাণে কতটা দুর্নীতি করা হয়েছে। সিমেন্টের পরিমাণ এতটাই কম দেয়া হয়েছে যে অল্প কয় দিনেই এ গুলো ভেঙে যেতে শুরু করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় জানান, এই ক্যানোপি নির্মাণে ১০ কোটি টাকার বাজেট ছিল। প্রথমে একটি পক্ষ এটি নির্মাণের কাজ পায়। তারা চলে যাওয়ার পরে অন্য গ্রুপ এই কাজ সম্পন্ন করে। নির্মাণে সীমাহীন দুর্নীতির কারণেই এই স্লাবগুলো ধসে পড়ছে।’ অবশ্য আরেকটি জায়গায় দেখা গেল ভেঙে যাওয়া স্লাবগুলোর স্থানে নতুন করে বসানোর জন্য বানানো হচ্ছে স্লাব। স্থানীয়দের সন্দেহ, এই স্লাবগুলো যে কতদিন টিকবে কে জানে।
ডাকাইত্তার খালে কোনো ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মিত হয়নি। ফলে এই ছোট খাল পার হতে হয় গাছের গুঁড়ি ফেলা সাঁকো দিয়ে। এরপর ক্যানোপিতে। এই ক্যানোপিতে উঠার জায়গার পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি ওয়াশরুম। সেটিও ব্যবহার অনুপযোগী। নোংরা। টাইলস বসানো ওয়াশরুমের বেসিনের পানির কল খুলে নিয়ে গেছে। টয়লেট ব্যবহার করার মতো কোনো পরিবেশ নেই। পাশেই বসানোর হয়েছে টিউবওয়েল। স্থানীয়রা জানান, এই টিউবওয়েল নির্মাণেও করা হয়েছে দুর্নীতি। পাইপ যত গভীরে পোতার কথা ছিল ততটা করা হয়নি। সিমেন্টের বাঁধাই করা টিউবওয়েলের পাড়। তবে সেই টিউবওয়েলে এক ফোঁটা পানিও উঠেনি। যে কারণে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে টিউবওয়েল। এতে স্থানীয়রা যেমন এই কলের সুবিধা পাচ্ছেন না তেমনি পর্যটকরাও।
ক্যানোপি পেরিয়ে চর পালিতা খাল বা কুকরি মুকরি ট্রলার ঘাট থেকে ছোট নৌকায় পার হয়ে যেতে হয় নারিকেল বাগানের দিকে। নারিকেল বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ল আরেকটি দুর্নীতির চিত্র। পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া দোতলা বিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ার। প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬-৭ বছর আগে এটি নির্মিত হয়েছিল। এটি নির্মাণেও হয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। ফলে অল্প কয় দিনেই খসে পড়েছে সব কিছু। দেয়াল ও ছাদের পলেস্তরা খসে পড়েছে। দরজা-জানালাগুলোও নেই। কাঁচ দিয়ে ঘেরা যে ঘর ছিল সেই কাঁচও নেই।
মূল আকর্ষণ নারিকেল বাগান। সেখানেই পর্যটকরা তাঁবু টানিয়ে রাত যাপন করেন। বনের মরা গাছের কাঠ, ডাল দিয়ে রান্নাবান্না করেন। কেউ কেউ সাথে করে সিলিন্ডার গ্যাস নিয়ে আসেন। সেখানে দু’টি খাবারের হোটেল দেখেছি এবার। কয়েকটি দোকান আছে চা-বিস্কুট পান করার জন্য। এখানে পর্যটকদের জন্য কিছু দূরে দূরে কয়েকটি টয়লেট ছিল। সাথে ছিল সক্রিয় টিউবওয়েলও। এবার মাত্র দু’টি টয়লেট ভালো পাওয়া গেল। সেখানকার টিউবওয়েলও ভালো। তা নারিকেল বাগান লাগোয়া। বাকি টয়লেটগুলোর মতো টিউবওয়েলগুলোও নষ্ট। ফলে প্রায় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যে পর্যটকরা এখানে ক্যাম্প করে থাকেন তাদের ওই একসাথে থাকা দু’টি টয়লেটের ওপরই ভরসা করতে হয়। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে বনেই কাজ সারেন।
অবশ্য আট বছর আগে এই চর কুকরি মুকরিতে সরকারি গেস্ট হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে। তা বেশ ভালো। তবে বনের আবহ পাওয়ার জন্য থাকতে হবে নারিকেল বাগানের তাঁবুতেই। সারা রাত শিয়াল ও রাতে জেগে থাকা পাখির ডাক, রাতে তাঁবুর পাশে খাবার সংগ্রহের জন্য শিয়ালের আগমন, সুযোগ পেলে শিয়ালের হানা দেয়া সবই পাওয়া যায় সেখানে।
এই চর কুকরি মুকরি সম্ভবত ১৯১২ সালে জেগে উঠে। ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে এই চরে বনায়ন শুরু হয়। এই চরের মোট আয়তন ২৫ কিলোমিটার। বনভূমির পরিমাণ ৮৫৬৫ হেক্টর। অভয়ারণ্য ২১৭ হেক্টর জমি। এই অভয়ারণ্যই মূল আকর্ষণ। চর কুকরি মুকরির খালে নৌকা নিয়ে ঘুরলে খালের পাড়ে খাস খেতে আসা হরিণ, বানরকে দেখা যাবে। ভোদরের দেখা মিলবে। অবশ্য এর জন্য ভাগ্যভালো হওয়া লাগবে। আমার অবশ্য বিভিন্ন সময়ে হরিণ, বানর ও শিয়াল দেখার সুযোগ হয়েছিল। বসন্তে বনের গাছগুলো নানান ধরনের ফুলে ভরে যায়। বলই গাছে গোলাপী ও হলুদ রঙের ফুল বিশেষ আকর্ষণ। শিমের ফুলের মতো দেখতে করমজা গাছের ফুল মে জুন মাসে ফোটে। সাথে জবা ফুলের মতো দেখতে ছৈলা গাছের ফুলের দেখা মিলবে বর্ষার সময়। এ ছাড়া হরগুজি কাঁটার বেগুনি ফুল এবং আরো নানান ফুল বসন্তে পর্যটকদের স্বাগত জানায় এই চর কুকরি মুকরিতে।