লোহাগাড়ায় গভীর রাতে পাহাড় কেটে সাবাড়
Printed Edition
মোছাদ্দেক হোসাইন লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় পাহাড় কেটে সাবাড় করছে প্রভাবশালী একটি মহল। প্রশাসনের নজর এড়াতে সন্ধ্যার পর তারা পাহাড় কাটা শুরু করেন, যা চলে ভোর পর্যন্ত। আর এসব পাহাড়ের মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে নিয়ে যাওয়া হয় জমি ভরাট, বাড়ি নির্মাণ, সড়ক সংস্কার এবং ইটভাটাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, পাহাড়টি লোকালয় থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় আশপাশে কোনো বসতি নেই। তবে পাহাড়ের পাদদেশে অন্তত আটটি মৎস্য খামার আছে। প্রায় তিন একর আয়তনের পাহাড়টির দক্ষিণ পাশে অন্তত ২০ শতক অংশের জায়গা কেটে মাটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাহাড়ের কাটা অংশের দাগ থেকে বুঝা যায়, এস্কাভেটর দিয়ে পাহাড়ের মাটি কাটা হয়েছে। পাহাড়ের সাথে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালাও সেই সাথে কেটে ফেলা হয়েছে।
প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার পাহাড়টির গায়ে বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ, ভেষজ গাছগাছালি, গুল্ম ও লতাপাতা রয়েছে। লোকালয় থেকে দুরে নির্জন পাহাড়টি অসংখ্য পাখির ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল। বর্তমানে এই পাহাড়টি বিলীন হওয়ার পথে। কাটতে কাটতে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে পাহাড়টি।
বর্তমানে যে পাহাড়টি কাটা হচ্ছে সেটি স্থানীয়ভাবে ‘কালুনির বর’ পাহাড় নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নে সেটির অবস্থান। রাতের আঁধারে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। জায়গাটি দুর্গম হওয়ায় গভীর রাতে পাহাড় কাটার খবরে প্রশাসন অভিযান চালনোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সরকারি পাহাড়টি স্থানীয় আবদু সালাম নামে এক ব্যক্তির দখলে ছিল। বর্তমানে সেটি পহর চাঁন্দা গ্রামের বাসিন্দা আবছার উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির দখলে। মৎস্য খামারগুলো পরিচালনা করেন আবছার উদ্দিন। কাজেই জায়গাটি আবছারের প্রজেক্ট নামেও পরিচিত। গত এক বছর আগে পাহাড় কাটা শুরু হয় এখানে। মাটি ভরাটের অর্ডার পাওয়ার পর থেমে থেমে চলে পাহাড় কাটা। সর্বশেষ গত এক মাস আগে থেকে পাহাড়টি ফের কাটা শুরু করেছেন আবছার উদ্দিন। রাত ১২টার পরেই পাহাড় কেটে মাটি সরানো হয়। গত শুক্রবার রাতেও পাহাড়টি কাটা হয়। পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে এটি এখন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাহাড় কাটায় নিজে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন আবছার উদ্দিন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় টাকার বিনিময়ে পাহাড়টির দখলিস্বত্ব পরিবর্তন হয়। সর্বশেষ আবদু সালামের কাছ থেকে সেটির দখলি স্বত্ব কিনে নেন মনছুর আলম নামে এক প্রবাসী। এলাকার কারো জায়গা ভরাটের জন্য মাটির প্রয়োজন হলে নিজেরাই মাটি কেটে নিয়ে যান তারা।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদফতরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।
আইন থাকলেও তা কার্যকরের অভাবে পাহাড়বেষ্টিত লোহাগাড়া উপজেলায় অবাধে পাহাড় ও টিলা কাটা হচ্ছে। এ কাজে জড়িত চক্রটি দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন, কোনোভাবেই পাহাড় কাটা যাবে না। আমরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে এ কাজে জড়িতদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেব।