ঐতিহ্যের স্বাদে চকবাজারে ইফতারের রঙিন ভুবন

Printed Edition
back-2
রমজানের প্রথম দিনে গতকাল চকবাজারের ইফতার বাজার : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

রমজানের প্রথম দিন থেকেই পুরান ঢাকার আকাশে যেন ভেসে ওঠে এক আলাদা গন্ধ- মসলার, ধোঁয়া, আর স্মৃতির। দুপুর গড়ালেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে শুরু হয় ইফতারের প্রস্তুতি। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই বাজার ঘিরে সৃষ্টি হয় এক বর্ণিল খাদ্যনগরী, যেখানে খাবার শুধু পেট ভরায় না, জাগিয়ে তোলে সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অনুভূতিও।

ঢাকার এই প্রাচীন এলাকার সরু রাস্তাগুলো বিকেলের দিকে ধীরে ধীরে জনারণ্যে পরিণত হয়। শাহী মসজিদের সামনের সার্কুলার রোডের দুই পাশে সারি সারি দোকান বসে। বড় কড়াইভর্তি টগবগে তেল, ধোঁয়া ওঠা শিক কাবাব, রঙিন শরবতের কাচের জার সব মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন ইফতারের এক জীবন্ত মঞ্চ।

জোহরের নামাজের পর থেকেই বিক্রেতাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। কেউ শিকে মাংস গেঁথে আগুনে বসাচ্ছেন, কেউ ট্রেতে সাজাচ্ছেন সোনালি রঙের জিলাপি, আবার কেউ বরফ-ঠাণ্ডা কাশ্মিরি ও ইরানি শরবত ঢালছেন বড় বড় জারে। দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড় জমতে না জমতেই শোনা যায় হাঁকডাক-

‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়!’

এই ডাক যেন চকবাজারের নিজস্ব সঙ্গীত, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।

শত পদের বাহার

প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই ইফতার বাজারের বিশেষত্ব তার বৈচিত্র্যে। এখানে প্রতিদিন মেলে শতাধিক পদ। আস্ত মুরগির কাবাব, মোরগ মুসাল্লম, বটি, টিকা ও শিক কাবাব, কোফতা, সুতিকাবাব- গোশতের বাহারে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পাশাপাশি আছে কোয়েল ও কবুতরের রোস্ট, যা পুরান ঢাকার স্বকীয় স্বাদ বহন করে।

শুধু গোশত নয়, ইফতারের টেবিল সাজাতে রয়েছে হালিম, দইবড়া, সমুচা, বেগুনি, নিমকপারা, নানা স্বাদের হালুয়া। মিষ্টিপ্রেমীদের টানে ভিড় করে ‘শাহী জিলাপি’। বড় বড় পাক ঘুরানো এই জিলাপির রং আর খাস্তা স্বাদ যেন ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পানীয়ের তালিকায় আছে লাবাং, দুধ-শরবত, তোকমা, রুহ আফজা ও নানা রঙের ফলের শরবত।

ঐতিহ্যের টানে মানুষের ঢল

শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দাই নন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও রমজান মাসের প্রতিদিন মানুষ ছুটে আসেন চকবাজারে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সাথে, আবার কেউ শুধু স্বাদের টানে। অনেকের কাছে এটি রমজানের আবেগঘন স্মৃতি- শৈশবের হাত ধরে বাবার সাথে বাজারে আসা, ঠোঙা ভরা জিলাপি নিয়ে বাড়ি ফেরা।

কথা বললে জানা যায়, কারো কাছে এটি ঐতিহ্যের টান, কারো কাছে রন্ধনশৈলীর অনুসন্ধান, আবার কারো কাছে সামাজিক মিলনমেলার জায়গা। ইফতারের আগে একসাথে কেনাকাটা, গল্প, হাসি- সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক বন্ধন।

সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি

চকবাজারের ইফতার কেবল খাবারের বাজার নয়; এটি পুরান ঢাকার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐক্যের প্রতীক। শত বছরের রেওয়াজে গড়ে ওঠা এই আয়োজন আজো একই উচ্ছ্বাসে টিকে আছে। আধুনিক ফুড কোর্ট বা রেস্টুরেন্টের ভিড়েও এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদের কাছে মানুষ বারবার ফিরে আসে।

রমজানের প্রথম দিনেই যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, তা জানিয়ে দেয়- সময়ের পরিবর্তন হলেও চকবাজারের ইফতারের আবেদন অমলিন। এখানে ইফতার মানে শুধু খাওয়া নয়, বরং ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে দেখা, স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচানো।

চকবাজার তাই প্রতি রমজানেই হয়ে ওঠে এক রঙিন ভুবন- যেখানে ইতিহাস, স্বাদ আর মানুষের গল্প মিশে যায় একই স্রোতে।

এবারের রমজানেও চকের দস্তরখানে ঐতিহ্যের রাজত্ব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও ঐতিহ্যের টানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

চকের বিশেষ কিছু পদের দরদাম : বড় বাপের পোলায় খায় : অন্তত ১২-১৫টি পদের মিশ্রণে তৈরি এই বিশেষ ইফতারি এ বছর কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কাবাবের মেলা : গরুর সুতি কাবাব কেজিপ্রতি ১,২০০ টাকা এবং খাসির সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১,৬০০ টাকায়।

রোস্ট ও ফ্রাই : আস্ত মুরগির ফ্রাই ৩০০ টাকা এবং ছোট-বড় সবার পছন্দের কোয়েল পাখির ফ্রাই মিলছে প্রতি পিস ৮০ টাকায়।

ভাজাভুজি ও মুখরোচক : আলুর চপ, বেগুনি ও কিমা কাবাবসহ নানা পদের ভাজাভুজি বিক্রি হচ্ছে গড়ে ১০ টাকা পিস হিসেবে।

মিষ্টান্ন ও পানীয় : কলিজা ঠাণ্ডা করতে ‘মহব্বতি শরবত’ ও ফালুদার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী দই বড়া পাওয়া যাচ্ছে। দই বড়ার ছোট প্যাক ১০০ টাকা এবং বড় প্যাক ২০০ টাকা।

সংবাদপত্রের পুরনো আর্কাইভ বলছে, নব্বইয়ের দশকে চকের বাজার ছিল অনেকটা ঘরোয়া। তখন মাটির হাঁড়িতে ফিরনি আর ফালুদা আসত সরাসরি কারিগরদের ঘর থেকে। এখন সেই বাজার বাণিজ্যিক রূপ নিলেও স্বাদ ও রন্ধনশৈলীতে পূর্বপুরুষদের সেই ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বর্তমান প্রজন্মের কারিগররা।