গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের চাপের মুখে একাট্টা ইউরোপ

নতুন কৌশল খুঁজছে ইইউ

Printed Edition

রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে আপাতত ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সম্মেলনে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রাসী মন্তব্যের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তার অবস্থান কঠোর করেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল সঙ্ঘাতের শুরু; সামনে আরো কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ককে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহে দাভোসে নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। ট্রাম্প প্রথমে গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা নাকচ করেন এবং আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করে নেন। পরিবর্তে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সাথে একটি ‘অস্পষ্ট চুক্তি’র কথা উল্লেখ করে বিষয়টিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করেন তিনি। তবে ইউরোপীয় নেতাদের স্পষ্ট বার্তা- ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। এ অনমনীয় অবস্থানের কারণেই ট্রাম্প কিছুটা পিছু হটেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের মুখে ইউরোপ এখন তাদের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে পরিবর্তনের কথা ভাবছে। ইইউ কর্মকর্তারা ‘কোয়ালিশন অফ দ্য উইলিং’ বা ‘ইচ্ছুকদের জোট’ মডেল নিয়ে আলোচনা করছেন। এ পদ্ধতিতে কোনো দেশ চাইলে এককভাবে ভেটো দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারবে না। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো কৌশলগত খাতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি দাভোসে মাঝারি শক্তিগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তবে আমাদের মেনুতে (শিকার হিসেবে) থাকতে হবে।’

ইউরোপ এখন রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার মতো জরুরি আইনি বিধানগুলো মার্কিন চাপের বিরুদ্ধেও ব্যবহারের কথা ভাবছে। আগামী মাস থেকে ‘মেড ইন ইউরোপ’ শর্ত এবং বিদেশী বিনিয়োগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আইন প্রণয়ন শুরু হবে। ইউরোপীয় কমিশনার স্তেফান সেজুর্নে জানান, প্রাথমিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে এসব আইন ভাবা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য সব বাজারের ঝুঁঁকি কমাতেও সহায়ক হবে।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে তাতে চিড় ধরেছে। ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে ‘বিনা খরচে সুবিধাভোগী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর প্রভাবে জার্মান কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎসে অংশীদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানালেও ইউরোপ এখন নিজেদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে ‘ঝুঁঁকিমুক্ত’ করতে মরিয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি কেবল একটি ভৌগোলিক বিতর্ক নয়, বরং এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোপের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।