ইংল্যান্ড-নরওয়ে ফুটবল দ্বৈরথের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস
Printed Edition
ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি জুড বেলিংহাম ও আর্লিং হলান্ডের মধ্যকার লড়াই হলেও দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল প্রায় ৪৫ বছর আগে এক রেডিও ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে।
১৯৮১ সালের সেই ঐতিহাসিক জয়
১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অসলোতে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল নরওয়ে। সেই সময় ইংল্যান্ড দলে ছিলেন বায়ার্ন রবসন গ্লেন হোডল , কেভিন কেগান ও ট্রেভর ফ্রান্সিসের মতো তারকা ফুটবলার। নরওয়ের জন্য এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়, আর ইংল্যান্ডের জন্য ছিল বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত পরাজয়।
কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সেই ধারাভাষ্য
ম্যাচ শেষে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের ধারাভাষ্যকার বিয়র্জ লিলেলিয়েন আবেগঘন ভাষণে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশে একে একে মন্তব্য করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘লর্ড নেলসন, লর্ড বিবারব্রুক, স্যার উইনস্টন চার্চিল, স্যার অ্যান্থনি ইডেন, ক্লেমেন্ট অ্যাটলি, হেনরি কুপার, লেডি ডায়ানা- আমরা সবাইকে হারিয়েছি।’ এরপর আসে সেই অমর উক্তি- ‘ম্যাগি থ্যাচার, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? আপনার জন্য আমাদের একটি বার্তা আছে। আমরা আপনার ছেলেদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করেছি। আপনার ভাষায় বলতে গেলে আপনার ছেলেরা ভয়ানকভাবে মার খেয়েছে।’
ইংরেজি বাক্য ‘ইয়োর বয়েস টুক এ হেল অফ এ বিটিং’ এরপর থেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ধারাভাষ্যে পরিণত হয়।
বাস্তবতা ছিল ভিন্ন
যদিও লিলেলিয়েন দাবি করেছিলেন ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে, বাস্তবে দলটি পরে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। তবু তার আবেগময় ভাষ্য জনপ্রিয়তায় এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে আজও ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচের আগে সেটি আলোচনায় ফিরে আসে। লিলেলিয়েন সবসময়ই দাবি করেছিলেন, পুরো ভাষণটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। ব্যক্তিগত জীবনে শান্ত স্বভাবের হলেও মাইক্রোফোনের সামনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। ১৯৮৭ সালে ৬০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও সেই ধারাভাষ্য তাকে অমর করে রেখেছে।
লিলেলিয়েনের ছেলে মারিয়াস লিলেলিয়েন এক প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, ‘রেডিওতে যাকে সবাই শুনত, তিনি নিজেকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করতেন। যেন কোনো শিল্পী কনসার্টে ওঠার আগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সম্প্রচারের বাইরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।’
সাবেক নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার ইজিল ওস্টেনস্টাড বলেন, লিলেলিয়েন ছিলেন প্রচলিত নরওয়েজিয়ানদের মতো সংযত নন। আবেগ প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। তার মতে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই এত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যসমৃদ্ধ ভাষ্য দেয়া ছিল অসাধারণ কৃতিত্ব। প্রিমিয়ার লিগ শুরুর পর থেকে প্রায় ১০০ জন নরওয়েজিয়ান ফুটবলার ইংল্যান্ডে খেলেছেন। মার্টিন ওডেগার্ড, ওলে গানার, মর্টিস গামস্ত এবং হালান্ড সবাই এই সম্পর্ককে আরো গভীর করেছেন। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে দুই দলের চারটি সাক্ষাতে ইংল্যান্ডের জয় একটি, ড্র একটি এবং নরওয়ের জয় দু’টি।
পুরুষদের বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। ১২ বছর পর আবারো দেখা হচ্ছে দুই দলের। মাঠে লড়াই হবে আধুনিক দুই শক্তির, তবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে বারবার ফিরে আসবে ১৯৮১ সালের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘ইয়োর বয়েস টুক এ হেল অফ এ বিটিং’। মায়ামির এই কোয়ার্টার ফাইনাল নতুন কোনো স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেবে কি না- সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।