দিনের আলোয় ডাকাতি : মরিনহো
Printed Edition
ক্রীড়া ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। ম্যাচের ৬৪ মিনিটে প্রতিপক্ষের তারিক মুহারেমোভিচকে ফাউল করার অপরাধে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সহায়তায় তাকে এই শাস্তি দেয়া হয়ছিল। নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ হারাবেন। কিন্তু তা হলো না। বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করল ফিফা। এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছিল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে আর্জেন্টিনা ও মিসরের রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচ।
আটলান্টায় গত পরশু শেষ হওয়া ম্যাচে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। যেখানে মিসরের দ্বিতীয় গোলটি অনেকক্ষণ পর বাতিল করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে যাওয়ায় ম্যাচের নিরপেক্ষতা নিয়েও উঠে প্রশ্ন। বিতর্কের শুরুটা হয়েছিল লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে যে ফাউল করা হয়েছিল তা নিয়ে। ভিএআরের রিভিউর পর তা নিয়ে সন্দেহ ছিল না। কিন্তু আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয় ফাউল হওয়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে মিসরের গোলের পর সেই ফাউলের সিদ্ধান্ত দেয়া নিয়ে। আর আসল বিতর্কটি তৈরি হয় আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের বিল্ড আপ নিয়ে। ম্যাচের ৯২ মিনিটে আর্জেন্টিনার ডি বক্সে সালাহর কাছ থেকে বল নেন জুলিয়ান আলভারেজ। সেখান থেকে বাড়ানো বল মাঠের অপর প্রান্তে লাউতারো মার্টিনেজের কাছে যায়। তার ক্রস থেকে গোল করে এনজো ফার্নান্দেজ ৩-২-এ এগিয়ে নেন আর্জেন্টিনাকে। আর তাতেই জয় নিশ্চিত হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
এই দফায়ও গোল নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না; কিন্তু আলভারেজ যখন সালাহর কাছ থেকে বল নেন তখন তাকে ফাউল করা হয় বলে আবেদন করেন মিসরের খেলোয়াড়রা। রেফারি অবশ্য সেই আবেদন আমলে নেননি, ভিএআরের কাছে রিভিউয়ের জন্যও যাননি। এরপরই অভিযোগ ওঠে যে রেফারি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যাওয়া গোলের বিল্ড আপের সময় রিভিউ নিলে এই দফায় কেন রিভিউ নেননি।
ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই ম্যাচকে ‘ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনিহোও ‘দিনের আলোয় ডাকাতি’ বলে মন্তব্য করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল থেকে জানা যায়, ম্যাচ শেষে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তার এই বিস্ফোরক মন্তব্যটি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম (যেমন : টুইটার ও ইনস্টাগ্রাম) এবং ক্রীড়াভিত্তিক পোর্টালে প্রকাশ পায়।
মরিনহো অভিযোগ করেন যে, মিসরের বিপক্ষে ম্যাচটিতে রেফারিং ও ভিএআর (ভার) ব্যবহার পুরোপুরি একপেশে ছিল এবং টুর্নামেন্টের চিত্রনাট্য যেন আর্জেন্টিনার পক্ষেই কাজ করছিল। একই সাথে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি একই পরিস্থিতিতে গোলটি আর্জেন্টিনা করত, তাহলে কি সেটিও বাতিল করা হতো? আমার মনে হয়, সম্ভাবনা খুবই কম।’ তার মতে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহর ওপর ফাউলের অভিযোগ থাকলেও সেখানে ভিএআর কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।
মিসরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সাবেক ফুটবলারসহ ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
সাবেক ফরাসি ফরোয়ার্ড থিয়েরি অঁরি ফক্স স্পোর্টসে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। মিসর, আফ্রিকা এবং সারা ফুটবল বিশ্বের সাথে অন্যায় হয়েছে।’
ফক্স স্পোর্টসে কমেন্ট্রি করা মেক্সিকো আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলা সাবেক ফুটবলার হ্যাভিয়ের হার্নান্দেজের মতে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে করা ওই ফাউলটি যথেষ্ট ‘সফট’ ফাউল ছিল এবং তার মতে ওই গোলটি বাতিল হওয়া উচিত হয়নি।
ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ইয়ান রাইট যুক্তরাজ্যের আইটিভি স্পোর্টসের অনুষ্ঠানে ঠিক এই প্রশ্নই তোলেন। সাথে তিনি দাবি করেন যে সালাহকে ফাউল করার জন্য আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল বাতিল হওয়া উচিত।
তবে ওই একই অনুষ্ঠানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন ইয়ান রাইটের দাবির বিপরীতে মন্তব্য করেন যে সালাহ অতি অল্পেই পায়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
আবার রয় কিন রেফারির সিদ্ধান্তের বিষয়ে এই মন্তব্যও করেন যে, ‘আপনি যদি ফুটবলে (অতীতে) দেখেন, তাহলে দেখবেন বড় দলগুলো সাধারণত এসব (বিতর্কিত) সিদ্ধান্তের সুবিধা পায়। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তের পরও আর্জেন্টিনার অর্জনকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ২-০ তে পিছিয়ে থেকে ১০-১১ মিনিট বাকি থাকার সময় তারা ম্যাচে ফিরে এসেছে।’
ফুটবল বিশ্লেষক আলি এল গার্নির মত কিছুটা ভিন্ন। তার ভাষায়, ‘রবড (ডাকাতি) বলা হয়তো অতিরঞ্জিত হবে। তবে ৫০-৫০ সিদ্ধান্তগুলোর প্রায় সবই আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে।’ তার দাবি, মিসরের বাতিল হওয়া গোলের আগে ফাউল ছিল; এ নিয়ে বিতর্ক কম। আসল প্রশ্ন হলো, গোল হওয়ার আগে ভিএআর কত দূর পর্যন্ত পেছনের ঘটনা পর্যালোচনা করতে পারে?
ম্যাচ শেষে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও সমর্থক রেফারির কিছু সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ তুললেও, সেই দাবি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে রেফারিং ছিল দুর্দান্ত। প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল নিখুঁত। আপনারাই বলুন, রেফারি কোন সিদ্ধান্তটি ভুল নিয়েছেন? আমি রেফারির সিদ্ধান্তে খুবই সন্তুষ্ট।’