বিশ্বকাপের শেষ আটে ইউরোপের দাপট
Printed Edition
আশিকুর রহমান
ইতিহাস বলছে, ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দলগুলোর সাফল্য খুব বেশি নয়। ১৯৩০ সালের পর মহাদেশের বাইরে আয়োজিত বিশ্বকাপে মাত্র দুইবার শিরোপা জিতেছে ইউরোপের কোনো দেশ। ২০১০ সালে স্পেন ও ২০১৪ সালে জার্মানি।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই ইতিহাস বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো। কারণ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আট দলের মধ্যে ছয়টিই ইউরোপের। বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, সুইজারল্যন্ড ও নরওয়ে। বাকি দু’টি দল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও মরক্কো।
১৯৯৪ সালের পর ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত কোনো বিশ্বকাপে শেষ আটে এত বেশি ইউরোপীয় দল আগে দেখা যায়নি।
ইউরোপের শুরুটা ছিল ধীর, তবে শেষটা বেশ দাপুটে। বিশ্বকাপের শুরুতে ইউরোপীয় দলগুলোর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলা প্রথম ১০ ইউরোপীয় দলের মধ্যে সাতটিই জয় পায়নি।
উত্তর আমেরিকার তীব্র গরমকে অনেকেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখলেও বেশির ভাগ কোচ সেটিকে অজুহাত বানাতে চাননি।
বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া মিসরের সাথে ড্রয়ের পর বলেন, ‘তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি হোক বা ৩০ ডিগ্রি, আমাদের আরো ভালো খেলতে হতো।’ অন্য দিকে কাতারের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন দলের সুযোগ নষ্টকেই ফলাফলের জন্য দায়ী করেন। তবে সময়ের সাথে নিজেদের ছন্দ ফিরে পায় ইউরোপীয় দলগুলো। গ্রুপ পর্ব শেষে অ-ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে তাদের রেকর্ড ছিল ১৭ জয়, ১২ ড্র ও মাত্র ৭ হার। শেষ ষোলোতেও ইউরোপের দলগুলো কঠিন পরীক্ষায় সফল হয়েছে। উচ্চতা ও দর্শকদের তীব্র সমর্থনের মধ্যে মেক্সিকোর বিপক্ষে খেলতে নেমেও ইংল্যান্ড জয় তুলে নেয়। দলটির পারফরম্যান্স দেখে সাবেক ইংল্যান্ড তারকা ওয়েন রুনি বলেন, ‘এই জয় প্রমাণ করেছে, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জেতার সামর্থ্য রয়েছে। এই ফল খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেবে।’
অন্য দিকে ফ্রান্স দল প্যারাগুয়ের কঠিন প্রতিরোধ পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। আর বেলজিয়াম স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার ম্যাট উপসন বলেন ‘বেলজিয়াম ভালো লক্ষণ দেখিয়েছে। তবে স্পেনের অসাধারণ মিডফিল্ডের বিপক্ষে তাদের সেরাটা খেলতে হবে।’
বিশ্বকাপে ইউরোপের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬টি স্থান, যা অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে বেশি। তাই শেষ আটে ইউরোপের শক্ত উপস্থিতি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। তবে ৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপ, অতিরিক্ত নকআউট পর্ব এবং পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিদায়, পাশাপাশি সহ-আয়োজক মেক্সিকো ও কানাডার শেষ ষোলো থেকেই ছিটকে পড়া ইউরোপের সাফল্যকে আরো উজ্জ্বল করেছে।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষ আট দলের পাঁচটিই ইউরোপের। তাদের মধ্যে চারটি দলই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। সপ্তম স্থানে থাকা পর্তুগাল অবশ্য শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই অন্যতম ফেবারিট ছিল ফ্রান্স। এখন পর্যন্ত সেই মর্যাদার প্রতিফলনও ঘটিয়েছে তারা। দলের তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে এরইমধ্যে সাত গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
সাবেক ইংল্যান্ড মিডফিল্ডার ড্যানি মারফি বলেন, ‘ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এত শক্তিশালী যে অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তারা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। রায়ান শেরকি, উসমান দেম্বেলে কিংবা দেজিরে দুয়ের মতো খেলোয়াড়রা বেঞ্চ থেকেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।’ সাবেক ফ্রান্স ডিফেন্ডার গেল ক্লিশি মনে করেন, ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডই শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
তবে এই বিশ্বকাপে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো খেলছে দু’টি ইউরোপীয় দল- নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড।
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড । টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে সাত গোল করা এই ফরোয়ার্ড কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইবেন।
অন্য দিকে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে সুইজারল্যান্ড। তবে শেষ চারে ওঠার পথে তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কঠিন বাধা।
সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিশ্বকাপে সুইস দলের সেরা অর্জনগুলোর একটিতে পৌঁছেছি; কিন্তু আমাদের যাত্রা এখানেই শেষ নয়।’ ইউরোপের দলগুলো এখন সেই যাত্রাকে আরো দীর্ঘ করতে চায়। লক্ষ্য একটাই- মহাদেশের বাইরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বিরল আরেকটি ইউরোপীয় শিরোপা জয়।