মিসরের পিরামিডে রেফারির হানা
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার এসেছে ভুল কমানোর জন্য। কিন্তু প্রযুক্তির চূড়ান্ত ব্যবহারও যখন মানুষের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে, তখন বিতর্ক পুরোপুরি এড়ানো যায় না। তাই শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাই আরো স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা। বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রতিটি ম্যাচ কোটি মানুষের আবেগের অংশ। সেখানে রেফারি যেন কখনোই মূল চরিত্র না হন। দর্শক ম্যাচ শেষে বিজয়ীর ফুটবল, পরাজিতের লড়াই কিংবা কোনো তারকার নৈপুণ্য নিয়ে কথা বলুক, বাঁশি নিয়ে নয়। কারণ রেফারিংয়ের বিতর্ক যত বাড়ে, ততই খাটো হয় খেলাটাই। আর সেই সাথে অযথাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায় প্রকৃত যোগ্যতার জোরে জিততে সক্ষম দলগুলোর সাফল্যও।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত সব কিছুই যেন মিসরের পক্ষে ছিল। দুই গোলের লিড, প্রতিপক্ষের বিদায়ের শঙ্কা আর গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস- সব মিলিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন তখন হাতছানি দিচ্ছিল আফ্রিকার দলটিকে। কিন্তু শেষ ১৩ মিনিটে বদলে যায় পুরো চিত্রনাট্য। দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফল নয়, বরং রেফারির একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। এমনকি নিরপেক্ষ দর্শকের মনেও প্রশ্ন জেগেছে, অসাধারণ একটি ফুটবল ম্যাচের সৌন্দর্য বিতর্কিত বাঁশির আড়ালে চাপা পড়ে গেল?
এই ম্যাচ পরিচালনা করেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। তার একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)। বিষয়টি ফিফার নজরে এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছে দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ। ইএফএর সভাপতি হানি আবু রিদা রেফারি লেতেক্সিয়ে এবং তার দুই সহকারী সিরিল মুনিয়ে ও মেহদি রহমানির সিদ্ধান্তের তদন্ত দাবি করেছেন। ফেডারেশনের যোগাযোগবিষয়ক প্রধান মোহাম্মদ মোরাদ লিখেছেন, ‘মিসর ফুটবল ফেডারেশন আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচ পরিচালনাকারী ফরাসি রেফারির বিরুদ্ধে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করছে।’
ম্যাচের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম ৫৮ মিনিটে। সে সময় মোস্তাফা জিকো গোল করে মিসরের ব্যবধান ২-০ করেন। কিন্তু পরে ভিএআরের সহায়তায় সেই গোল বাতিল করা হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে পেছন থেকে জার্সি টেনে ফেলে দেন মিসরের এক ফুটবলার। রেফারি শেষ পর্যন্ত গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন, যা নিয়ে মিসর শিবিরে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
এরপর ম্যাচের শেষ দিকে আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে মোহাম্মদ সালাহ পড়ে গেলেও পেনাল্টির বাঁশি বাজাননি লেতেক্সিয়ে। মিসরের দাবি, ওই মুহূর্তে তারা স্পষ্টভাবে পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পথে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল নিয়েও আপত্তি তুলেছে আফ্রিকার দলটি। মিসরের অভিযোগ, আক্রমণ শুরুর আগে ফাতির ওপর ফাউল হয়েছিল এবং সেই ঘটনাতেই তাদের একটি পেনাল্টি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেই আক্রমণ থেকেই শেষ পর্যন্ত আসে এনসো ফার্নান্দেসের জয়সূচক গোল।
ম্যাচ শেষে ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি মিসরের স্ট্রাইকার মোস্তাফা জিকো। রেফারিকে জালিম আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রেফারি অন্যায় করেছেন। আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট, তিনিই সর্বোত্তম রক্ষাকর্তা। তিনি একটি পুরো দেশের পরিশ্রম নষ্ট করে দিয়েছেন।’ এরপর আরো বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, ‘এই কাপটা আর্জেন্টিনার জন্যই নির্ধারিত।’
ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত সব কিছুই ছিল মিসরের নিয়ন্ত্রণে। দুই গোলের লিড, আত্মবিশ্বাসী ফুটবল আর গ্যালারিতে উচ্ছ্বসিত সমর্থক সব মিলিয়ে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের সামনে তখন কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন। কিন্তু শেষ ১৩ মিনিটে পাল্টে যায় পুরো গল্প। আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নেয়। তবে নাটকীয় এই প্রত্যাবর্তনের মাঝেই প্রশ্ন ওঠে রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে। বিশেষ করে একটি পেনাল্টি, ফাউলের ব্যাখ্যা এবং সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও বিতর্ক দেখা দেয়। অনেকের মতে, সিদ্ধান্তগুলো অন্তত আবার খতিয়ে দেখার মতো ছিল।
এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে আর্জেন্টিনারই। কারণ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিভা, অভিজ্ঞতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বহুবার তারা প্রমাণ করেছে, কঠিন পরিস্থিতি থেকেও ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য তাদের আছে। অথচ বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে একটি সফল প্রত্যাবর্তনের গল্প অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে ম্লান হয়ে গেছে।
অবশ্য এটি চলতি বিশ্বকাপে রেফারিং নিয়ে প্রথম প্রশ্ন নয়। গ্রুপ পর্ব থেকেই অফসাইড, হ্যান্ডবল, পেনাল্টি এবং অতিরিক্ত সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক ম্যাচে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও পর্যালোচনা করেও সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি দর্শকরা, আবার কোথাও একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত এসেছে। ফলে ধারাবাহিকতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই হারের ক্ষত আরো গভীর করেছে রেফারিং বিতর্ক। তাই মাঠের লড়াই শেষ হলেও বিষয়টি এখন গড়িয়েছে প্রশাসনিক পর্যায়ে। ফিফা মিসরের অভিযোগের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচনার বিষয়।
উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ম্যাচের শেষ দিকে মিসরের বেঞ্চের একজন কোচিং স্টাফকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। এর পরই রেফারির দিকে তাকিয়ে দুই হাত দিয়ে ‘এক্স’ আকৃতির একটি ইশারা করেন প্রধান কোচ হোসাম হাসান। এই ‘এক্স’ ইশারার অর্থ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ জানাতে এমন সঙ্কেত ব্যবহার করা হলেও এই ম্যাচে হাসান ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই এটি করেছেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
এরপর পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন মিসরের এক বদলি খেলোয়াড়। পরে কোচ ইব্রাহিম হাসান এসে হোসাম হাসানকে শান্ত করেন এবং রেফারির সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। আলোচনার একপর্যায়ে ইব্রাহিমকে রেফারির দিকে ‘থাম্বস-আপ’ ইশারা করতেও দেখা যায়। তবে ঘটনাটির পর রেফারি আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে হোসাম হাসান বলেন, ‘খেলাধুলায়, বিশেষ করে ফুটবলে ন্যায়বিচার কোথায়? সুন্দর ভাষায় বিষয়টি বলতে চাই না। আজ আমাদের সাথে অন্যায় করা হয়েছে। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনার পক্ষেই সিদ্ধান্ত গেছে এবং রেফারিংয়ে নিরপেক্ষতার অভাব ছিল। তারা চেয়েছিল বিশ^চ্যাম্পিয়নরা টিকে থাকুক তথা মেসি টিকে থাকুক।’
তিনি আরো দাবি করেন, ফ্রান্সের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে এই ম্যাচে দায়িত্ব দেয়ার বিরোধিতা করেছিল মিসর। পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘এটিই আমার প্রতিবাদের ভাষা। এই বিশ্বকাপে আমি আর একটি ম্যাচও দেখব না।’
রেফারিং নিয়ে আরো ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্মান বা ফেয়ার প্লে কিছুই পাইনি। মোহাম্মদ সালাহর ওপর হওয়া ফাউলের ঘটনায় সম্ভাব্য পেনাল্টি দেয়া হয়নি, এমনকি ভিএআরেও দেখা হয়নি। আমাদের দ্বিতীয় গোলও অদ্ভুতভাবে বাতিল করা হয়েছে।’
৩৭ বছর বয়সী ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ইউরোপের অন্যতম অভিজ্ঞ রেফারি হিসেবে পরিচিত। চলতি বিশ্বকাপে এর আগে কেপ ভার্দে-সৌদি আরব ও আইভরি কোস্ট-ইকুয়েডর ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি। এ ছাড়া ২০২১ সালের ইউরোপা লিগ ফাইনাল, ২০২৩ সালের উয়েফা সুপার কাপ এবং ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও দায়িত্ব পালন করেছেন এই ফরাসি রেফারি!