কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণে ইউরোপ-আফ্রিকা

ফ্রান্স-মরক্কো

Printed Edition
khela-1
ফ্রান্সের ফিলিপ মাতেতা, ম্যাক্সেন্স ল্যাক্রোয়া, মাগনেস আক্লিওশ ও মালো গুস্তোর সাথে প্র্যাকটিস সেশনে খুনসুটিতে মেতেছেন প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশম / কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নামার আগে প্রশিক্ষণ সেশনে মরক্কোর মিডফিল্ডার বিলাল এল খানুস ও ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরে শেষ ষোলো শেষে এবার শুরু কোয়ার্টার ফাইনাল। সেমিফাইনালে ওঠার প্রথম লড়াইয়ে মুখোমুখি ইউরোপ বনাম আফ্রিকা। ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সকে মোকাবেলা করবে আফ্রিকার সফল দল মরক্কো। প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছিল ফরাসিরা। অন্য দিকে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক কানাডার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে কোয়ার্টারে উঠেছিল মরক্কো। টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় এই লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা। এক দিকে কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে হারের প্রতিশোধের মিশন আফ্রিকার দেশটি, অন্য দিকে আধিপত্য বজায় রেখে শেষ চারে পৌঁছায় লক্ষ্য ফ্রান্সের। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে মাঠের লড়াইয়ে নামবে দুই দল।

শেষ ষোলোতে দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে দুই দলই। এখন লক্ষ্য সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করা। বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে শুরু করেছিল ফ্রান্স। তাদের শক্তিশালী স্কোয়াড, অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফ এবং বড় ম্যাচে খেলার অভিজ্ঞতা দলটিকে সবসময়ই এগিয়ে রাখে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর শেষ ষোলোতে তারা আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে জয় তুলে নেয়। ফরাসি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আক্রমণভাগের গতি, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের ভারসাম্য। প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে তারা খুবই দক্ষ।

মরক্কো আবারো প্রমাণ করেছে তাদের সাম্প্রতিক সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে ওঠার পর থেকেই তারা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এবারো তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং দুর্দান্ত দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। শেষ ষোলোতে তাদের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স প্রতিপক্ষদের জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্কোয়াডের গভীরতা। বেঞ্চে থাকা খেলোয়াড়রাও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। দ্রুত উইং প্লে, সৃজনশীল মিডফিল্ড এবং কার্যকর ফিনিশিং তাদের বড় অস্ত্র। বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্য নিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকেও সমান দক্ষ তারা। টানা পাঁচটি জয় লেস ব্লুজরা গ্রুপ ‘আই’-এর শীর্ষে উঠতে সাহায্য করেছে। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলাকে নিয়ে গড়া শক্তিশালী আক্রমণভাগের চারজনকে নিখুঁতভাবে সঙ্গ দিচ্ছেন দেজির দুয়ে। যার নিপুণ ফুটওয়ার্ক প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সেই গুরুত্বপূর্ণ স্পট-কিকটি নিশ্চিত করেছিল।

দিদিয়ের দেশমের তত্ত্বাবধানে ফ্রান্স শেষ ১২টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মধ্যে ১১টিতেই জিতেছে। ঘরের মাঠে বিশ্বজয়ী ১৯৯৮ সালের দলের অধিনায়কত্ব করার পাশাপাশি, দেশম আজ তার ২৫তম বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনা করতে চলেছেন, যা হেলমুট শনের দীর্ঘদিনের রেকর্ডের সমান হবে।

মরক্কোর প্রধান শক্তি হলো তাদের সংগঠিত রক্ষণ। তারা প্রতিপক্ষকে সহজে গোলের সুযোগ দেয় না। পাশাপাশি দ্রুতগতির উইঙ্গার ও কাউন্টার অ্যাটাক তাদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র। বড় দলের বিপক্ষে কিভাবে ধৈর্য ধরে খেলতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে আফ্রিকার দেশটির। সুযোগ পেলেই আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে দলটি।

কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে টানা পাঁচটি ম্যাচে অপরাজিত আছে মরক্কো। তারা আফ্রিকান ফুটবলের জন্য নতুন মাইলফলক স্থাপন করে চলেছে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা মোহাম্মদ ওয়াহবির দল গ্রুপ ‘সি’-তে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করার পর পেনাল্টিতে নেদারল্যান্ডসকে এবং টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক কানাডাকে সহজেই পরাজিত করে। শেষ ষোলোর ম্যাচে মন্থর শুরুর পর দ্বিতীয়ার্ধে আজ্জেদিন উনাহির জোড়া গোলে মরক্কো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং অতিরিক্ত সময়ে বদলি খেলোয়াড় সোফিয়ান রাহিমি শেষ গোলটি করেন। এর ফলে জানুয়ারির বিতর্কিত আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স ফাইনালের পর থেকে তারা টানা ১০টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখাই তাদের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালের এই মহারণ।

শেষ আটে লড়াইয়ে নামার আগে মরক্কোর ফিটনেস নিয়ে প্রধান সংশয় বায়ার্ন মিউনিখের নতুন খেলোয়াড় ইসমাইল সাইবারি। যিনি গ্রুপ পর্বে মুগ্ধ করলেও শেষ ষোলোর ম্যাচে শুরুতেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। তার হ্যামস্ট্রিংয়ে চোটের কারণে আক্রমণভাগে খেলতে পারেন রাহিমি।

দুই দলের লড়াই অনেকটাই নির্ভর করবে মাঝমাঠের ওপর। ফ্রান্স যদি বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে মরক্কোর রক্ষণকে চাপে ফেলতে পারবে। অন্য দিকে মরক্কো যদি মাঝমাঠে প্রেসিং করে ফরাসি খেলোয়াড়দের ভুল করতে বাধ্য করতে পারে, তাহলে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোলের সুযোগ তৈরি হবে।

নকআউট ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা অনেক বড় বিষয়। ফ্রান্সের রয়েছে বড় ম্যাচ জেতার অভিজ্ঞতা। তবে মরক্কো ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, তারা চাপ সামলাতে পারে এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য রাখে। তাই এই ম্যাচে মানসিক প্রস্তুতি ও ছোট ছোট ভুল এড়িয়ে চলাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

ফুটবল ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পাঁচবার ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়েছে মরক্কো। কোনো অফিসিয়াল ম্যাচে মরক্কো কখনোই হারাতে পারেনি ফ্রান্সকে। তিনটি ম্যাচে জয় পেয়েছে ইউরোপের দেশটি। বাকি দুই ম্যাচই ড্র। সবশেষ দুই দলের মোকাবেলা হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপ আসরে কাতারের মাঠে। সেমিফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে পরাজিত করেছিল ফ্রান্স।