বড় ঋণের স্বচ্ছতা যাচাইয়ে মাঠে বাংলাদেশ ব্যাংক
অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার যোগসাজশ রোধে কড়া পদক্ষেপ
Printed Edition
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, ঋণের অপব্যবহার এবং একই গ্রাহককে বারবার নতুন ঋণ দিয়ে পুরনো খেলাপি ঋণ সমন্বয় করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতাদের বাস্তব কার্যক্রম সরেজমিন যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল সরাসরি বিভিন্ন ব্যাংকের বড় ঋণগ্রহীতাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা ও ব্যবসায়িক আউটলেটে গিয়ে মূল বিষয়টি খতিয়ে দেখছে- অনুমোদিত ঋণের অর্থ প্রকৃত উৎপাদন, শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি কেবল পুরনো ঋণ ঢাকতেই নতুন ঋণ দেয়া হয়েছে?
পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রগুলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিশেষ পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য হলো ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ করা এবং ব্যাংকের ঋণ যাতে সরাসরি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তা সুনিশ্চিত করা। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ ব্যবহারের সঠিক খাত ও স্বচ্ছতা; প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও উৎপাদন সক্ষমতা; ঘোষিত কর্মসংস্থানের বাস্তব রূপ এবং প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ফ্লো (নগদ প্রবাহ) ও ব্যবসায়িক গতিশীলতা বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে বহু ব্যাংক অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী গ্রাহকদের যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূতভাবে বড় বড় ঋণ অনুমোদন করেছে। পরে সেই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকগুলো প্রকৃত অর্থ আদায়ের চেষ্টা না করে উল্টো একই গ্রাহককে নতুন ঋণ দিয়ে পুরনো ঋণ সমন্বয় বা নিয়মিত দেখানোর পথ বেছে নেয়। এতে কাগজে-কলমে ঋণ ‘নিয়মিত’ দেখানো হলেও বাস্তবে ব্যাংকের ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী অতীতে ১০০ কোটি টাকার একটি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা নতুন ঋণ দেয়ার মাধ্যমে সমন্বয় করতে করতে কয়েক ধাপে শতক থেকে হাজার কোটি টাকার বিশাল দায় বা ঋণে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা বা উৎপাদনে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না থাকলেও নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে পুরনো দায় আড়াল করার এই ক্ষতিকর প্রবণতা ব্যাংকিং খাতকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রকে অস্পষ্ট করে রেখেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা এখন আর কেবল ফাইলপত্র বা ঋণের ডকুমেন্টের ওপর নির্ভর করছেন না; বরং সরেজমিন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কার্যক্রম খতিয়ে দেখছেন : ১. কারখানা কিংবা প্রকল্প বাস্তবে চালু আছে কি না; ২. ঋণের টাকায় কাক্সিক্ষত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে কি না এবং সেখানে উৎপাদন চলছে কি না; ৩. কাগজে-কলমে যে পরিমাণ শ্রমিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বাস্তবে কর্মরত আছেন কি না; ৪. ঋণের অর্থ ঘোষিত খাতের বাইরে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে কি না।
প্রয়োজনে ব্যাংকের পরিদর্শকরা সরবরাহকারী, পণ্য ক্রেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও তথ্য মিলিয়ে শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করছেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, মূল বিষয় হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা- ব্যাংকগুলো কি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে সহায়তা করছে, নাকি কেবল পুরনো সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে নতুন অর্থের মোড়কে আড়াল করছে? কারণ নতুন ঋণ যদি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে কেবল পুরনো দায় সমন্বয়ে ব্যবহৃত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন শিল্পায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ঋণের টাকা যদি ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে অন্য দিকে চলে যায় কিংবা পুরনো ঋণ লুকাতে ব্যবহৃত হয়, তবে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান চূড়ান্তভাবে নষ্ট হয় এবং আর্থিক খাতে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকরা আরো মনে করেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ‘প্রকল্প সম্ভাব্যতা যাচাই’ ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে ঋণ বিতরণের পর নজরদারি না থাকায় গ্রাহকরা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে একই সুবিধাভোগী বারবার নতুন ঋণ পেয়েছেন এবং ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড় গড়ে উঠেছে।
কড়া জবাবদিহি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাম্প্রতিক উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু অনিয়ম শনাক্ত করাই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আর্থিক জরিমানা কিংবা প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। অনিয়মে জড়িত ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিদর্শন কার্যক্রম নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর হবে। নতুন ঋণ দেয়ার আগে প্রকল্পের বাস্তবতা যাচাই এবং ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত তদারকির একটি সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এর ফলে এক দিকে যেমন প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থায়নের সুযোগ পাবেন, অন্য দিকে কাগুজে ব্যবসা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং খাতের সার্বিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন সফল হলে দেশের উৎপাদন, প্রকৃত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণেও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সর্বোপরি এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে- ব্যাংকের নতুন ঋণ দেশের অর্থনীতিকে সত্যি গতিশীল করছে, নাকি পুরনো ক্ষতকে নতুন ঋণের আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা চলছে।