ডাকাতের চমৎকার উপদেশ

Printed Edition
agdum-1
ডাকাতের চমৎকার উপদেশ

ইকবাল কবীর মোহন

ইমাম গাজালি রহ:-এর নাম আমরা সবাই জানি। হিজরি দশম শতকে তিনি দুনিয়ায় জ্ঞান গরিমার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইমাম গাজালি রহ: ১০৫৮ সালে ইরানের খোরাসান প্রদেশের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ আল গাজালি। সুতা কাটা তার পেশ ছিল। তাই তাকে গাজালি বলা হতো। ‘গাজাল’ অর্থ সুতা কাটা। শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা তিনি তুস নগরীতে সম্পন্ন করেন।

তখনকার দিনে যারা ইসলামের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চাইত তারা নিশাপুরে গিয়ে হাজির হতো। তখন নিশাপুর ছিল জ্ঞান অর্জনের সেরা এক কেন্দ্র। ইমাম গাজালি তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর আরো অধিক জ্ঞান লাভের ইচ্ছা পোষণ করেন। তাই তিনি নিশাপুরে গিয়ে হাজির হলেন। ইমাম গাজালি রহ: ছোটবেলা থেকেই খুব প্রখর ও ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাই সহজেই তিনি শিক্ষকদের কাছে প্রিয় ছাত্রের মর্যাদা লাভ করেন। কোনো কিছু যাতে ভুলে না যান, এ জন্য ইমাম গাজালি রহ: তার শিক্ষকদের সব কথা ও উপদেশ লিখে রাখতেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি এসব লেখা অত্যন্ত যতœসহকারে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে সংরক্ষণ করতেন। আর এসব বিষয় তিনি তার জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান বলে বিবেচনা করতেন।

কয়েক বছর পরের ঘটনা। ইমাম গাজালি রহ: তার দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন। এ জন্য তিনি তার সব দলিল ও জ্ঞানের লিখিত সঞ্চয় ভালো করে একটা পুঁটলীতে বেঁধে নিলেন। তারপর একদিন তিনি একটি কাফেলার সাথে তার দেশের উদ্দেশে রওনা করেন।

পথিমধ্যে কাফেলাটি একদল ডাকাতের হাতে ধরা পড়ল। ডাকাতরা কাফেলার সবার মূল্যবান সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেল। ইমাম গাজালি রহ:-এর বোঝাটিও ডাকাতদের চোখে পড়ল। ডাকাতরা ভাবল অবশ্যই এই বোঝার মধ্যে মূল্যবান হয়তো কিছু থাকতে পারে। তাই তারা এটি তালাশ করে দেখতে চাইল।

ডাকাতদের আগ্রহ দেখে ইমাম গাজালি রহ: ভয় পেয়ে গেলেন। জীবনের সব মূল্যবান জ্ঞানের অনেক কিছু এই পুঁটলীর ভেতরে আছে। এর কোনো ক্ষতি হলে তার জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই ইমাম গাজালি ডাকাতদের অনুরোধ করে বললেন, ‘তোমরা আমার সাথে যা আছে তার সবকিছু নিয়ে নাও। কিন্তু আমার এই বোঝায় তোমরা হাত দিও না।’

ইমাম গাজালি রহ:-এর অনুরোধ শুনে ডাকাতদের সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। তারা ভাবল নিশ্চয়ই এই বোঝায় মূল্যবান কিছু থাকতে পারে। গাজালি নিশ্চয়ই তা লুকানোর চেষ্টা করছে। তাই ডাকাতরা বোঝাটি খুলল। কিন্তু ডাকাতরা কিছু লিখিত নোট ছাড়া বোঝায় আর কিছুই পেল না।

এবার ডাকাতরা বলল, তোমার বোঝার মধ্যে এগুলো কী? এসব কাগজপত্র ও দলিল দস্তাবেজ তোমার কি কাজে লাগবে?’

ইমাম গাজালি রহ: জবাবে বললেন, ‘এসব কাগজের কোনো মূল্য তোমাদের কাছে হয়তো নেই। অথচ আমার কাছে এগুলোর মূল্য অনেক বেশি।’

ডাকাতরা বিষয়টি বুঝতে পারল না। তারা এর মূল্য জানার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করল। কী এমন প্রয়োজন এসব কাগজ দিয়ে, তারা ইমামকে জিজ্ঞেস করল।

ইমাম গাজালি রহ: জবাবে বললেন,

‘এগুলো আমার শ্রমের ফসল। তোমরা যদি এগুলো নষ্ট করে দাও, তা হলে আমি শেষ হয়ে যাবো। আমার জীবনের বহু বছরের ফসল ধ্বংস হয়ে যাবে।’

ডাকাতদের একজন ছিল খুব বুদ্ধিমান। সে বলল, ‘আচ্ছা তুমি যা জানো, এসব কাগজে কি তাই লেখা আছে?’

ইমাম গাজালি রহ: বললেন,

‘হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক।’

ডাকাত বলল, ‘বেশ, এই কয়েক টুকরো কাগজে যে জ্ঞানের কথা লেখা আছে, তা যদি সহজে চুরি হয়ে যায়, তা হলে তা মোটেও জ্ঞান নয়। তুমি চলে যাও এবং এটা সম্পর্কে ও তোমার সম্পর্কে ভেবে দেখো।’

একজন সামান্য ডাকাতের এই মন্তব্য ইমাম গাজালি রহ:-এর মনকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিলো। তিনি ভাবলেন, তিনি তোতা পাখির মতো কতগুলো জ্ঞানের কথা জেনেছেন এবং তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তিনি মনে করলেন, আসলে তিনি জানেন বেশি, কিন্তু তিনি কম ভেবেছেন। তাই তিনি যদি প্রকৃত অর্থে ভালো ছাত্র হতে চান, তা হলে তাকে জ্ঞান আত্মস্থ করতে প্রকৃত হবে। চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। আর তারপর তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

এরপর থেকে ইমাম গাজালি রহ: জ্ঞানের প্রতি আরো গভীর মনোনিবেশ করলেন। ফলে তিনি দুনিয়ার একজন বড় মাপের পণ্ডিত ও ইসলামী চিন্তাবিদ হতে পেরেছিলেন। পরিণত বয়সে ইমাম গাজালি রহ: একবার মন্তব্য করেন, ‘সবচেয়ে ভালো উপদেশ ছিল সেটি, যেটি আমি লাভ করেছিলাম একজন ডাকাতের কাছ থেকে। আর এই উপদেশই আমার জীবনকে বদলে দিয়েছিল।’