মিয়ানমারে নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন জয়ের পথে জান্তা সমর্থিত দল

Printed Edition
onno-2
মিয়ানমারে নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন জয়ের পথে জান্তা সমর্থিত দল

রয়টার্স

মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের আবহেই তিন ধাপের জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রোববার দেশজুড়ে ৬০টি টাউনশিপে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হয়। জান্তা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পথে রয়েছে।

নির্বাচনের আগের দুই পর্বের ভোট ২৮ ডিসেম্বর ও ১১ জানুয়ারি গ্রহণ করা হয়। ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো প্রধান শহরগুলোতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের উপস্থিত ছিল নগণ্য। নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে, যা ২০১৫ ও ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম। ওই দুই সাধারণ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দুই ধাপের ভোটগণনা শেষে ইউএসডিপি এককভাবে নিম্নকক্ষের ২০৯টি আসনের মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষের ৭৮টি আসনের মধ্যে ৫২টি আসনে জয়লাভ করে আধিপত্য বিস্তার করেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের উভয় কক্ষের ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে জান্তা সমর্থিত দল এবং সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে নতুন সরকার গঠনে তাদের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসর নিয়ে এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। আগামী এপ্রিলে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে জান্তা কর্তৃপক্ষের। আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচন চরমভাবে সমালোচিত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান (অঝঊঅঘ) এই নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি এবং তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেবে না।

জাতিসঙ্ঘ এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, অং সান সু চির জনপ্রিয় দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসিকে (এনএলডি) ভেঙে দেয়া এবং সু চিকে কারাবন্দী রাখার মাধ্যমে জান্তা সরকার একটি অসম ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য হলো সামরিক শাসনের ওপর একটি বেসামরিক বৈধতার আবরণ দেয়া।

মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত থাকার কারণে অনেক জায়গায় ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। রাখাইন, শান এবং কায়িন রাজ্যে বিমান হামলা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রেফতার বা প্রতিহিংসার আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন। নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন বা সমালোচনা করার অভিযোগে জান্তা সরকার ইতোমধ্যে চার শতাধিক মানুষকে কারাদণ্ড প্রদান করেছে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই মিয়ানমার একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যা দেশটির গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন কিনা তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।

অপরদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বলছে, এ নির্বাচন নতুন একটি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, যা এপ্রিলে হতে পারে। মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) গত দুই পর্বের ভোটের ফলাফলে এ পর্যন্ত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ২০৯টি আসনের মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষের ৭৮টি আসনের মধ্যে ৫২টি নিশ্চিত করেছে। ফলে দলটি ইতোমধ্যেই প্রভাবশালী অবস্থানে চলে গেছে।

২০১০ সালে গঠিত ইউএসডিপি পূর্ববর্তী সামরিক সরকারের অবসানের পর পাঁচ বছর দেশটি পরিচালনা করেছে। দলটির চেয়ারম্যান একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। দলটির শীর্ষ পদগুলোতে সামরিক বাহিনীর সাবেক অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আছেন। মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকে গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশকই সামরিক বাহিনী দেশটি শাসন করেছে। দেশটির রাজনীতিতে নিজেদের এই নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা থেকে সামরিক বাহিনীর সরে যাওয়ার কোনো বাস্তব অভিপ্রায় এ পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়নি।