শরীফের শখের বাগানে এখন উৎপাদন হচ্ছে দেশী-বিদেশী অর্ধশত জাতের ফল

পাহাড়ে ৫০ একর আয়তনের বাগানে সারা বছর ফল পাওয়া যায়

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
Printed Edition

উচুঁ-নিচু পাহাড়ের ঢালুতে গাছে গাছে ঝুলছে নানা জাতের ফল। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। চোখে পড়বে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ। কোন গাছের ডালে ফল ঝুলছে, কোন গাছে ফুল আসছে, আবার কোন গাছ পরিচর্চা করা হচ্ছে। বছরের ১২ মাসই কোন না কোন ফল থাকবে এই বাগানে। এখানে দেশী-বিদেশী প্রায় অর্ধশত ফলের গাছ রয়েছে। বাগানটির অবস্থান চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পাহাড়ে। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো: ওমর শরীফ তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এই বাগান। নামকরণ করেছেন তার মায়ের নামে জোহরা এগ্রো ফামর্স অ্যান্ড নার্সারি।

শুধু মিরসরাই কিংবা চট্টগ্রামে নয়, বাংলাদেশে প্রথম কয়েকটি ফলের প্রথমে আবাদ হয়েছে এই বাগানে। বাগানে অ্যাভোকাডো, থাই সফেদা, পিচফল ও এলাচসহ নামীদামি অনেক দুর্লভ ফল ও মসলার চাষ হচ্ছে। পাহাড়ের মাটিতে ভিনদেশী ফলের বিপ্লব ঘটিয়েছেন তিনি। যুক্ত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা দুর্লভ ও মূল্যবান সব গাছের চারা। গত ২০ জুন মিরসরাই উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে মৌসুমি ফল মেলায় নিজের বাগানে উৎপাদিত প্রায় ৪০ জাতের ফলের প্রদর্শনী করে পুরস্কার অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ফল মেলায় আগত দর্শনার্থীরা অবাক হয়েছে এক বাগান থেকে এতো ফলের উৎপাদন দেখে।

২০০৩ সালে শখের বসে পাহাড়ে বাগান শুরু করেছেন ওমর শরীফ। শুরুটা সহজ ছিল না। সমতল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বাগানে যেতে হতো। রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমে প্রায় ৫০ একর আয়তনের স্বপ্নের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। তার সংগ্রহে রয়েছে দেশী-বিদেশী অনেক ফুল, ফল ও ঔষধি গাছের চারা। চারা সংগ্রহ করতে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছুটে চলেছেন ভিনদেশেও। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব ও পাশ্ববর্তী ভারতে গেছেন বেশ কয়েকবার। স্বপ্ন ছিল এক সময় দেশে গড়ে তুলবেন সব ধরনের দুর্লভ গাছের চারা। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা, সততার উপর ভর করে বুকভরা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন শরীফ। তার দেখা-দেখি উৎসাহ পেয়ে সহযোগিতা নিয়ে অনেক বেকার যুবক বাগান গড়ে তুলেছেন।

তার বাগানে রয়েছে চাকাপাত আম, কিউজাই, ব্যানানা, রামগই, বারি-৪, গৌড়মতি, আম্রপলি, কাটিমন, ব্রুনাই কিং, চিয়াংমাই, মরিয়ম, কোকোনাট, মিয়াজাকি, অম্বিকা, জেসি জাতের আম।

এ ছাড়া রয়েছে- তেঁতুল, চেনাক ফ্রুট, বারমাসি মাল্টা, চাইনিজ কমলা, দার্জিলিং কমলা, চায়না-৩ লিচু, ভিয়েতনাম নারিকেল, ঘাব, এভাকাডো, রাম্বুটান, লংগান, লটকন, এমবি-২ আনারস, সিয়াম গ্রিন নারিকেল, থাই মিস্টি লেবু, অমলকী, পিচ ফল, বেরিকেডেট মাল্টা, থাই সপেদা, থাই অমলকী, ড্রাগন, তিনফল, থাইজাম্বুরা, মাতুয়া, আবিও, কাঁঠাল, ডুরিয়ান, পুলসান, লিচু, কাজুবাদামসহ অর্ধশত ফলের গাছ। রয়েছে এলাচ, দারচিনি, আদা ও লবঙ্গ। নার্সারিতে সব ধরনের গাছের চারা রয়েছে। তার এই অভাবনীয় সাফল্য মিরসরাই তথা বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

কথা হয় তরুণ উদ্যোক্তা ওমর শরীফের সাথে। তিনি জানান, ২০০৩ সালে শখের বসে পাহাড়ে কয়েকটি জাতের গাছের চারা রোপণ করে বাগান শুরু করেন। ওই এলাকায় কারো যাতায়াত ছিল না। ধীরে ধীরে বাগানে বিভিন্ন জাতের ফলদ, মসল্লা ও ঔষধি গাছের বাগান গড়ে তুলেছেন।

তিনি বলেন, এই পর্যায়ে আসতে পথটা অত সহজ ছিল না। চারা এনে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায় না, এর চাষের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিও রয়েছে। তা বুঝতে সময় লেগেছে। রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তারপরও হাল ছাড়িনি। চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে পড়াশোনা করে তার প্রয়োগ ঘটিয়ে তবেই সফলতা এসেছে। ওমর শরীফ বলেন, বিশে^র নতুন নতুন উদ্ভাবিত ফল ও ফলের চারা সংগ্রহ করা আমার নেশা। এরপর সেগুলো থেকে চারা গজিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করে থাকি। কৃষি বিভাগ ও মসলা ইনস্টিটিউশনের কর্মকর্তারা একাধিকবার ওমর শরীফের বাগান পরিদর্শন করেছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা ওমর শরীফের বাগানে দেশী-বিদেশী অনেক ফল উৎপাদিত হচ্ছে। তার ধ্যান, জ্ঞান সব নার্সারি ও বাগান নিয়ে। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে এই বাগান গড়ে তুলেছেন। এবার আমাদের ফল মেলায় তিনি অনেক জাতের ফল প্রদর্শনী করেছেন। এই বাগানে অনেক দুর্লভ ফলের গাছ রয়েছে। তার দেখাদেখি অনেকে বাগান গড়ে তুলছে।