দিগন্ত সাহিত্য কবিতাবলী

Printed Edition
sahitto-kobita
দিগন্ত সাহিত্য কবিতাবলী

আবু এন এম ওয়াহিদ

হাদি

হাদির মাথার ভেতর

এখনও কি আলো জ্বলে?

নাকি গুলির শব্দ করুণ কান্না হয়ে কথা বলে

হঠাৎ কে যেন আলোর উপর কালো

কালি ঢেলে দিয়েছে?

হাসপাতালের সাদা ঘর

আজ বাংলাদেশের মানচিত্র

একটা মাথা, একটা বালিশ,

আর কোটি মানুষের নিঃশ্বাস আটকে

থাকার ব্যথা নিয়ে বেরোবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

গুলির ভাষা খুব ছোট,

সে শুধু থামাতে জানে

কিন্তু হাদির জীবন

একটা দীর্ঘ বাক্য,

যেখানে দাঁড়ি-কমা নেই

যেখানে মাথা নত করার যতিচিহ্ন নেই।

মৃত্যু এসেছিল হাদির কাছে,

কিন্তু বড্ড দেরি করে

তার আগেই সে

ভয়ের গলা টিপে ধরেছিল,

তার আগেই মৃত্যু

হাদির চোখে চোখ রেখে

হেরে গিয়েছিল।

হাদির মাথার ক্ষত দিয়ে রক্ত নয়,

জীবন্ত ইতিহাস ঝরে পড়ছে

যে ইতিহাস বলে, মানুষকে মেরে ফেলা যায়,

কিন্তু মানুষ হওয়ার অর্থকে হত্যা করা যায় না।

হাদি, তুমি এখন একা নও

তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে

একসাথে একটি জাতির বুক ধুকধুক

করে ওঠানামা করছে।

যদি অন্ধকার নামে,

আমরা আলোর মশাল মাথার উপর তুলে ধরব

যদি ঘুম আসে, আমরা জেগে থাকব

কারণ কিছু মানুষ

মৃত্যুকে জয় করার জন্যই জন্মায়,

তারা বেঁচে থাকে চিরদিন, প্রতিদিন।


মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান

নিষিদ্ধ নগরে

দিয়ে গেছে জুলাই চব্বিশ

ভালোবাসার গান,

বিলীন করে নিজের জীবন

শত সহস্র প্রাণ।

দেশের তরে যুদ্ধ করে

সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ-সবে

ফিরিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতা

বাজি রেখে প্রাণ।

হাজার মায়ের আহাজারি

ভাসে আকাশে-বাতাসে,

ফিরবে না আর পরানের খোকা

বুক খালি করে গেছে চলে।

হয়নি বিচার প্রেতাত্মাদের

বুক ফুলিয়ে ঘোরে,

শহীদ মায়ের আহাজারিতে

খোদার আরশ কাঁপে।

অত্যাচারীর খড়গ অনল

পুড়ে দিচ্ছে সব,

জীবন নিতে মত্ত যত

স্বৈরাচারের দল।


শাওন আসগর

মূল্যহীন জীবন

শুধু ভয় শঙ্কা দ্বিধা নিয়ে হাঁটছি প্রতিদিন

মৃত্যুকে ভয় পেলাম, আক্রমণকে, অপমানকে

দুর্নিবার দুঃসাহসেও রুখে দাঁড়াতে পারলাম না।

মূল্যহীন জীবন

কখনো কারো মনে ঠাঁই হলো না

বৃক্ষের মতো দাঁড়াতে পারলাম না

পুষ্পের মতন গন্ধ বিলাতে পারলাম না

না পারলাম দুর্দিনে দুঃসাহসে একা একা লড়তে

না পারলাম পদভারে এই জনপদ কাঁপাতে, ইতিহাস হতে।

মূল্যহীন জীবন

মৃত সমতুল্য এই রক্তহিম বরফের জীবন

আর জাগ্রত হবার সময় কোথায় স্লোগানে

মিছিলে রাজপথে জায়গা পাওয়ার সময় কোথায়?

মূল্যহীন জীবন

চোখে অশ্রু ফেলবে এমনও কেউ নেই

কাফন নিয়ে বিনম্র ধীরে ধীরে হাঁটবে নেই

আমার কোনো শব্দ নিয়ে উচ্চারিত হবে কোরাস

তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। আহা মূল্যহীন জীবন।


এ কে আজাদ

সবাই হাদি

বুকের ভেতর ভিসুভিয়াস, রক্তে আগুন জ্বলে,

শোকের তুষার চোখের কোণায় ঝর্ণা হয়ে গলে।

মীর জাফরের বুলেট বোমায় সিরাজরা হয় বিদ্ধ,

হৃদয়টারে উমিচাঁদরাই করছে অগ্নি-সিদ্ধ।

এমন রাতে চাঁদের চোখে অশ্রু খোঁজে ভাষা,

সে ভাষাতে নেইকো আওয়াজ কেবলি কুয়াশা।

বিপ্লবীদের রক্তে আগুন বারেক জ্বলে যদি,

সে আগুনে ছাই হয়ে যায় দস্যু-দানোর গদি।

রক্ত-নদী পার হয়ে যায় হোক না যতই ক্ষত,

নতুন করে জন্মে যে বীর ফিনিক্স পাখির মতো।

আসে যদি অত্যাচারী, আসবে প্রতিবাদী,

প্রতি বিন্দু রক্ত থেকে জন্ম নেবে হাদি।

হাদির রক্তে বেইমানি নেই, আগুন হয়ে জ্বলবে,

এক সে হাদির ইনসাফী বোল লক্ষ হাদি বলবে।

এক সে হাদির বুকের সাহস লক্ষ হাদির বুকেতে,

হাদি হাদি সবাই হাদি রব উঠেছে মুখেতে।


মোস্তফা হায়দার

তারাদের মিছিলে

এই রাত যেন কভু শেষ রাত না হয়

যাদের ইচ্ছেগুলো দাঁড়াতে সময় নিচ্ছে

যাদের স্বপ্নগুলো কবিতার মতো ভাসছে

মানুষের ভালোবাসাই দেখছে এ দু’চোখ।

রাতের আঁধারে মিটমিট করা জুনি খুঁজছে

যে জুনির শক্তির কাছে সময় বড্ড অসহায়

শতাব্দীর শোকেস ভেঙে বের হয় নব্যালো

তাকে পাওয়ার সূত্রাবলিতে বিশ্বাস রাখছে!

রাতের বেয়াড়া বাতায়নে জাগ্রত ইচ্ছেপুরুষ

সবুজের গাত্র খোলে হাসে ওই আকাশের চোখ

মনুষ্যচোখের দীনতায় হাসে রাতের চোখগুলো

তিমির জায়নামাজে ভাসে তোমার সব উচ্চারণ।

রাতের কেদারায় ভেসে ওঠা বিশ্বাসে, পাকাপোক্ত

তারাদের মিছিলে জ্বলে ওঠা তুমি সেই স্বপ্নসাধক!


মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

মৃত্যুর মধ্যদিয়ে

সীমান্তের পরেও অদৃশ্য বিস্তৃতি

অসীম আকাশ

চোখে নামায় যে পাখি অনাগত সূর্যোদয়

সোনালি ভোর উজ্জ্বল লাবণ্য

সে পাখির দিকেই তাক করা থাকে ঘাতক ধনুক

হেমলকের আতশী তরল...

মাটি ভেদ করে অঙ্কুরিত বীজে

মূল শেকড়ে বাড়ে কিছু চারাগাছ

কিছু নাম না-জানা ফুল ফোটে বাগানে

ঝরে গিয়ে সৌরভ ছড়ায়

অবিনশ্বর অবিনাশী শক্তিতে বলীয়ান

বিপ্লবীর ধর্মই বিপ্লব

বন্দুকের নল গলায় ঠেকিয়ে ফেরাতে গেলেও

কিছু কণ্ঠ দ্রোহের বারুদে জ্বলে ওঠে

মৃত্যুর মধ্যদিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠা বীরত্ব

স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখে ইতিহাস।