সরকারের পুঞ্জিভূত ব্যাংক ঋণ ৮ লাখ ৮১,৫৬৮ কোটি টাকা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
সরকারের পুঞ্জিভূত ব্যাংক ঋণের পরিমান দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৮১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্রেজারি বন্ড ও এসপিটিবি থেকে সর্বোচ্চ ছয় লাখ ২৮ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৬৮ শতাংশ); ট্রেজারি বিল থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা; কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা এবং ‘সুকুক’ থেকে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক ‘ডেট বুলেটিন’ এর সর্বশেষ সংখ্যায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গত মার্চ মাস পর্যন্ত এ হিসেব দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে সরকারের পুঞ্জিভূত ঋণ ছিল সাত লাখ ৭৪ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা।
এ দিকে চলতি ২০২৬ বছরের গত মার্চ শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী) ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫৯ হাজার ১০১ কোটি টাকা। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের স্থিতি ছিল ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি পঞ্জিকা বছরের গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তিন মাসে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ৫২ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের হিসাব মতে, সরকারের মোট পুঞ্জিভূত ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৫৭ শতাংশ। অন্য দিকে পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৪৩ শতাংশ।
এ দিকে ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে সরকারের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে তিন লাখ ৩২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ২৬ শতাংশ) এবং অন্যান্য (জিপিএফ) খাত থেকে ৮১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৬ শতাংশ) নেয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মতে, সরকারের ঋণ বাড়লেও এটি এখনো ঝুঁকিসীমার নিচে রয়েছে। বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ-রফতানি অনুপাত ১৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পুঞ্জিভূত ঋণ স্থিতির বাইরে সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টি
অর্থ বিভাগের ডেট বুলিটিনের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, সরকারের এ পুঞ্জিভূত ঋণ হিসাবের বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দেশী-বিদেশী গৃহীত ঋণের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত সার্বভৌম গ্যারান্টি বা দায় রয়েছে। গত মার্চ শেষে এ ধরনের গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ এক হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৪৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।
সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণ
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজেট ঘাটতি। সরকারের ব্যয় সাধারণত রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ নিতে হয়। বিশেষ করে কর-রাজস্ব কম হলে এই নির্ভরতা আরো বাড়ে। আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আগামীতে আরো বাড়বে বলে পূর্বাভাষ দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার ঋণ গ্রহণ করে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, বন্দর, নগর অবকাঠামোসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এসব প্রকল্প অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলা করতেও সরকার বিভিন্ন সময়ে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। চতুর্থত, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, দুর্যোগ ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আয় একই হারে না বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে ঋণ নেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে।