রাজনৈতিকভাবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো নেই
পেছনে কাজ করছে ভূরাজনীতি : অধ্যাপক ইমতিয়াজ
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
রাজনৈতিকভাবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো অবস্থায় নেই। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যে ভালো নেই, সেটা বলা ঠিক হবে না। স্বাধীনতার পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক ধারায় বয়ে চলেনি। এটা বিভিন্ন সরকারের আমলে উঠানামা করেছে। এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পেছনে ভূরাজনীতিও কাজ করছে।
বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে ভারতের আগ্রহে ভাটা পড়েছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অলটারনেটিভের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকে ভারতে আশ্রয় নেন, যার মধ্যে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানে পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় পুরো সময়টাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রিসহ দেশটির সামরিক নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কাজ করতে আগ্রহী। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রুটিন কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।
গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে দুই বছর পূর্তির দিনে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া দিল্লির মাথুয়া রোডে অবস্থিত সার মার্ক টালি মিলনায়তনে ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে শেখ হাসিনা ছাড়াও তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাহবুবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে এবং বিএনপি সরকারকে মানবাধিকারবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে বিদেশীদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ সরকার এই আয়োজন বন্ধে আগে থেকেই ভারত সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুধু জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হচ্ছে। এতে প্রকাশিত কোনো মতামতের প্রতি দিল্লির সমর্থন নেই। অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ভারত যদি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে তাদের মাটিতে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সাথে দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন, মনে রাখতে হবে, দুটো বিপরীত। আশা করি, ভারতের কর্তৃপক্ষ ও ভারত সরকার বিষয়টি বুঝবে।’
এ সব ব্যাপারে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দুই দেশের সম্পর্কে একাধিক মাত্রা থাকে। রাজনৈতিক মাত্রায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো অবস্থায় নেই। তবে বাণিজ্যিক মাত্রায় সম্পর্ক যে ভালো নেই, সেটা বলা ঠিক হবে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দেখা গেছে, ভারত থেকে আমাদের পণ্য আমদানি কমেছিল, কিন্তু রফতানি ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেভাবে প্রভাব ফেলেনি। এখন নির্বাচিত সরকারের সময়ে দেখা দরকার, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কী? ভারতের সাথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল মিলিয়ে ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যবসার ক্ষেত্রে ভাটা আমরা লক্ষ করছি না। সম্প্রতি ভিসা শিথিল হওয়ার পর চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেতে চাচ্ছে।
ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপির ব্যাপক বিজয়ের পেছনে স্থানীয় রাজনীতিকরা ‘বাংলাদেশবিরোধী’ ইস্যুকে কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী মনোভাব সক্রিয় রয়েছে। রাজনীতিকদের কথাবার্তা এটিকে সময়ে সময়ে উস্কে দেয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক ধারায় বয়ে চলেনি। এটা বিভিন্ন সরকারের আমলে উঠানামা করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিশাল আকারের মিছিল দেখা গিয়েছিল। এই উঠানামার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের রাজনীতি রয়েছে। এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে পেছনে ভূরাজনীতিও কাজ করছে। কোনো দেশ হয়তো ভিন্ন কোনো দেশের মনোযোগ চাচ্ছে। কার কী উদ্দেশ্য এটা নিয়ে আরো গবেষণা করা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, দুই দেশের রাজনীতিকদের কথাবার্তা নেতিবাচক, কিন্তু ব্যবসাবাণিজ্য ঠিকই চলছে।
ভারত প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক ভালো করার কথা বলছে, অথচ বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি সত্ত্বেও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাসহ অন্যদের দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিচ্ছে। এটা দ্বিচারিতা কিনা জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জনবিচ্ছিন্নতা এড়াতে রাজনীতিকরা সবসময় আলোচনায় থাকতে চান। ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দও এর ব্যতিক্রম নয়। দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিতে পেরেছেন। এই সংবাদ সম্মেলন পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু পরদিনই ভারতের হাইকমিশনার আমাদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন, যাতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাই মোদ্দা কথায় বলা যায়, বাংলাদেশ তার স্বার্থকে সমুন্নত রেখেই ভারতের সাথে সুসম্পর্ক চায়। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ ভারতের সাথে বাংলাদেশের নানাবিধ ইস্যু রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যসহ সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতেরও স্বার্থ রয়েছে। তবে কোনো ইস্যুতে সম্পর্কের টানাপড়েনে জনগণের ভোগান্তি যাতে না বাড়ে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।