অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে তিন বড় ঝুঁকি

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
  • ১৮০ দিনের হিসাব-নিকাশ
  • রিজার্ভে স্বস্তি, ভেতরে সঙ্কট

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি আপাত-বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক খাতে যে চাপ গত কয়েক বছরে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছিল, সেখানে এখন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। রেমিট্যান্স বেড়েছে, রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে, আমদানি প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত রয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি- বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও মূল্যস্ফীতি- এখনো গভীর চাপের মধ্যে।

ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে সরলভাবে ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি একে সঙ্কটগ্রস্ত অর্থনীতি বলেও পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। বরং এটি বাহ্যিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের সাথে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার সহাবস্থান- যেখানে বৈদেশিক খাত অর্থনীতিকে সময় কিনে দিচ্ছে, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

রেমিট্যান্সে শক্তি, রিজার্ভে স্বস্তি

অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বৈদেশিক খাতে। চলতি বছরের ৬ আগস্ট শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলার; আন্তর্জাতিক হিসাব-পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী তা ৩২ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে মোট রিজার্ভ ছিল ৩০.০৮ বিলিয়ন এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ২৫.০৬ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ এক বছরে শুধু রিজার্ভের পরিমাণই বাড়েনি, বিপিএম৬ হিসাবেও অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তবে মোট রিজার্ভ ও বিপিএম৬ রিজার্ভের ব্যবধান কমে আসাকে সরাসরি রিজার্ভের ‘গুণগত মান’ বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; দুই হিসাবের সংজ্ঞাগত পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত শক্তির জায়গাটি হলো- বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। অর্থবছর’২৬-এ প্রবাসী আয় ১৭.৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি শুধু রিজার্ভ বাড়ায়নি; আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাড়তি সক্ষমতা দিয়েছে।

অন্য দিকে রফতানি ৭.৭৪ শতাংশ বেড়ে ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আমদানি ৬৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বৈদেশিক ভারসাম্যের উন্নতির মূল ভিত্তি এখনো রফতানি-আমদানি ব্যবধান পুরোপুরি কমে যাওয়া নয়; বরং রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ।

এখানেই ঝুঁকিও রয়েছে। রেমিট্যান্স যদি ভবিষ্যতে ধীর হয়ে যায়, তাহলে বর্তমান বহিঃস্থ স্বস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ দুর্বল হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তাই রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং পরিষেবা রফতানি বাড়ানো জরুরি।

ডলারের বাজারে স্থিতি এসেছে, কিন্তু টাকার ওপর চাপ শেষ হয়নি

৬ আগস্ট ২০২৬-এ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২৩.৮২ টাকা, এক বছর আগে যা ছিল ১২১.৯৪ টাকা। অর্থাৎ টাকা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় ধরনের অস্থিরতার পরিবর্তে বিনিময় হার এখন তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে।

এটি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ডলারের বিপরীতে টাকার দীর্ঘমেয়াদি চাপ পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলা যাবে না। কারণ বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈশ্বিক পণ্যমূল্য- সবই বিনিময় হারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অতএব রিজার্ভ বাড়ার অর্থ এই নয় যে, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি শেষ। বরং বলা যায়, তাৎক্ষণিক বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্কট থেকে বাংলাদেশ একটি অধিক ব্যবস্থাপনাযোগ্য অবস্থানে এসেছে।

মূল্যস্ফীতি কমছে, কিন্তু মানুষের স্বস্তি ফিরছে না

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে জটিল বাস্তবতা মূল্যস্ফীতি। জুন ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। মে মাসে তা ছিল ৯.৪২ শতাংশ। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও জুন শেষে ৮.৬৮ শতাংশ-যদিও এক বছর আগে একই সময়ে তা ছিল ১০.১৩ শতাংশ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কমা মানে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; এর অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও দৈনন্দিন ব্যয়ের যে মূল্যস্তর তৈরি হয়েছে, তা এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় আগের উচ্চ স্তরেই রয়েছে। ফলে সামষ্টিক সূচকে উন্নতি এবং সাধারণ মানুষের অনুভূত অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। এই অবস্থায় শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা, খাদ্য বাজারের প্রতিযোগিতা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কারও প্রয়োজন।

সতর্ক সঙ্কেত : সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি ঋণ শুকিয়ে যাচ্ছে

অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় ঋণপ্রবাহে। জুন ২০২৬-এ সরকারি খাতে নিট ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫১ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ, যা আগের বছরের ৬.৪৯ শতাংশেরও নিচে। এই দুই সূচককে পাশাপাশি রাখলেই অর্থনীতির সমস্যাটি স্পষ্ট হয়।

সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়ছে, অথচ উদ্যোক্তা ও ব্যবসার জন্য ব্যাংকঋণের প্রবাহ দুর্বল। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থ কোথায় যাচ্ছে- এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এটিকে সরাসরি ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা কিছুটা অতিসরলীকরণ হবে, কারণ সরকারি ঋণ বৃদ্ধিই একমাত্র কারণ নয়। ব্যাংকের দুর্বল ব্যালান্সশিট, উচ্চ ঝুঁকি, খেলাপি ঋণ, ঋণের মূল্য, উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদাও বেসরকারি ঋণ কমার কারণ হতে পারে।

তবে ফলাফলটি উদ্বেগজনক, রাষ্ট্র অর্থায়নের বড় অংশ শোষণ করছে, আর বেসরকারি খাত একই সময়ে নতুন ঋণ ও বিনিয়োগে পিছিয়ে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়বে না।

ব্যাংকিং খাত : অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ঝুঁকি

খেলাপি ঋণের চিত্র বাংলাদেশের আর্থিক খাতের গভীর সঙ্কটকে সামনে নিয়ে এসেছে। মার্চ ২০২৪-এ শ্রেণিকৃত ঋণের হার যেখানে ১১.১১ শতাংশ ছিল, জুন ২০২৫-এ তা ৩৪.৪০ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। মার্চ ২০২৬-এ কিছুটা কমে তা ৩২.২৬ শতাংশ হয়েছে। হার কিছুটা কমলেও ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষণ নয়।

এখানে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো- খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়। এটি ব্যাংকের মূলধন, তারল্য, ঋণ দেয়ার সক্ষমতা এবং আমানতকারীর আস্থাকে প্রভাবিত করে। ব্যাংক যখন পুরনো ঋণের ক্ষতি সামাল দিতে ব্যস্ত থাকে, তখন নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে যায়।

নিট খেলাপি ঋণের হার জুন ২০২৫-এর ২৫.০৮ শতাংশ থেকে মার্চ ২০২৬-এ ১৫.০১ শতাংশে নেমেছে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও সংখ্যাটি এখনো অত্যন্ত উচ্চ।

অতএব খেলাপি ঋণের সামান্য পতনকে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট কাটার প্রমাণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত- খেলাপি ঋণ কীভাবে সৃষ্টি হলো, কারা ঋণ পেয়েছে, কতটা পুনঃতফসিল হয়েছে এবং ব্যাংকগুলো সেই ক্ষতির বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করেছে কি না।

বিনিয়োগের সঙ্কেত : শিল্প সম্প্রসারণে দ্বিধা

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সঙ্কেতগুলোর একটি আসছে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি থেকে। মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি সেটেলমেন্ট ২৫.৪২ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রেও পতন ৮.৮৫ শতাংশ। এর অর্থ সরাসরি এই নয় যে পুরো শিল্প খাত সঙ্কুচিত হয়েছে; তবে এটি অবশ্যই নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সতর্কতার শক্তিশালী ইঙ্গিত।

এর বিপরীতে শিল্প কাঁচামাল আমদানি ৮.৩৭ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম আমদানি ৬.৪২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি থেমে নেই। বরং বর্তমান শিল্প সক্ষমতা সচল রাখার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি, নতুন সক্ষমতা তৈরির প্রবণতা কম।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সমস্যা এখন শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; বরং ভবিষ্যৎ উৎপাদনক্ষমতা তৈরির গতি দুর্বল হয়ে পড়া।

কৃষিতে ঋণপ্রবাহ ভালো, কিন্তু শিল্পে একই গতি নেই

অর্থবছর’২৬-এ কৃষি ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার বেশি, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৯.৮৩ শতাংশ। কৃষি ঋণ আদায়ও ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। এটি অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক। কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রবাহ উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমর্থন করতে পারে।

শিল্প মেয়াদি ঋণে ২১.০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এটিকে বৃহত্তর বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার আগে অন্যান্য সূচক- বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি, বেসরকারি ঋণ এবং শিল্প উৎপাদন, একসাথে দেখতে হবে।

অর্থনীতিতে বিচ্ছিন্ন কিছু ইতিবাচক সূচক আছে; সমস্যা হলো সেগুলো এখনো সমগ্র বিনিয়োগচক্রকে শক্তিশালী করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

প্রবৃদ্ধি : পুনরুদ্ধার আছে, কিন্তু শক্তিশালী নয়

অর্থবছর’২৫-এ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৯ শতাংশ এবং অর্থবছর’২৬-এ তা ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রাক্কলন রয়েছে। প্রবৃদ্ধির এই পুনরুদ্ধার ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের অতীত প্রবৃদ্ধির সাথে তুলনা করলে এটি এখনো নিম্নগতি। ফলে প্রশ্ন হলো- ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কি একটি নতুন স্থিতিশীল নিম্ন প্রবৃদ্ধির যুগের সূচনা, নাকি এটি উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে ফেরার মধ্যবর্তী ধাপ?

এর উত্তর নির্ভর করবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ওপর।

রেমিট্যান্স ও ভোগব্যয় অর্থনীতিকে স্বল্পমেয়াদে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন শিল্প বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি এবং বেসরকারি পুঁজি।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বেসরকারি ঋণের দুর্বলতা তাই প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক সঙ্কেত দিচ্ছে।

পুঁজিবাজারে উত্থান : আস্থার সঙ্কেত, বাস্তব অর্থনীতির বিকল্প নয়

৬ আগস্ট ২০২৬-এ ডিএক্সইএক্স ৫,৪৭১.১৬ পয়েন্টে, যা এক বছরে ১৩.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে সিএসইর সিএএসপিআই ১৪.২৬ শতাংশ বেড়ে ১৫,৩৫৫.২৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারের এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার সম্ভাব্য সঙ্কেত। তবে শেয়ারবাজারের সূচক বৃদ্ধি এবং বাস্তব অর্থনীতির মৌলিক শক্তি এক বিষয় নয়।

যদি ব্যাংকিং খাত দুর্বল থাকে, বেসরকারি ঋণ কম থাকে এবং শিল্প বিনিয়োগ স্থবির থাকে, তাহলে শুধু শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ণয় করা যাবে না।

বরং দেখতে হবে বাজারের উত্থানের পেছনে কোম্পানির আয়, করপোরেট বিনিয়োগ, নতুন তালিকাভুক্তি, লেনদেনের গভীরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কতটা ভূমিকা রাখছে।

অর্থনীতির বর্তমান চিত্র : তিন স্তরের বিভাজন

সরবরাহকৃত সূচকগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়।

প্রথম স্তর- বাহ্যিক খাত : রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের কারণে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।

দ্বিতীয় স্তর-সামষ্টিক স্থিতিশীলতা : মূল্যস্ফীতি কমছে, বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল, কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো অস্বস্তিকরভাবে বেশি।

তৃতীয় স্তর- অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আর্থিক ব্যবস্থা : সবচেয়ে দুর্বল। খেলাপি ঋণ বিপজ্জনক মাত্রায়, বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্ন, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কম এবং সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে।

এই তিন স্তরের মধ্যে সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হলো প্রথম স্তরের উন্নতিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে রূপান্তর করা।

অর্থাৎ রেমিট্যান্স থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা যেন শুধু রিজার্ভ বাড়িয়ে থেমে না থাকে; তা যেন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, আমদানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক আস্থায় রূপান্তরিত হয়।

সামনে সবচেয়ে বড় পাঁচ ঝুঁকি

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট। খেলাপি ঋণ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পুনরুদ্ধার করা না গেলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে ব্যাংকনির্ভর সরকারি অর্থায়ন বেসরকারি খাতের অর্থায়নে চাপ তৈরি করতে পারে।

তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগ না করলে ৪ শতাংশের আশপাশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় পরিণত হতে পারে।

চতুর্থত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে, যা পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় ও ভোগক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

পঞ্চমত, রেমিট্যান্সনির্ভর বৈদেশিক ভারসাম্য। রেমিট্যান্সের শক্তি বর্তমান সঙ্কট সামলাতে সাহায্য করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক সক্ষমতার ভিত্তি হতে হলে রফতানি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

এখন কী করা দরকার

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় ‘আরো ঋণ’ নয়, বরং ভালো ঋণ এবং সঠিক জায়গায় পুঁজি প্রবাহ।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মূলধন পুনর্গঠন। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে সমস্যাকে কাগজে ছোট দেখানোর পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষতি প্রকাশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় মধ্যমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মান উন্নত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। শুধু ব্যাংকঋণের সুদ কমালেই হবে না; ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহ, জমি, করব্যবস্থা, আমদানি প্রক্রিয়া এবং নীতির ধারাবাহিকতার সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।

সর্বশেষে, রেমিট্যান্সের বর্তমান শক্তিকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে প্রবাহিত করার নীতি প্রয়োজন। প্রবাসী আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে আনার জন্য নিরাপদ আর্থিক পণ্য, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের সুযোগ এবং আস্থাশীল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

সঙ্কট কাটেনি, সঙ্কটের চরিত্র বদলেছে

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর আগের মতো প্রধানত বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটে আটকে নেই। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতি অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-বলয় দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বস্তি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও উৎপাদন কাঠামোর দুর্বলতা আড়াল করতে পারছে না।

আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- বৈদেশিক খাত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে, কিন্তু ব্যাংকিং খাত অর্থনীতিকে পর্যাপ্তভাবে অর্থায়ন করতে পারছে না; সরকার ঋণ নিচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি খাত বিনিয়োগে পিছিয়ে; মূল্যস্ফীতি কমছে, কিন্তু মূল্যস্তর এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে; প্রবৃদ্ধি ফিরছে, কিন্তু উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির বিনিয়োগ এখনো দুর্বল।

সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে সবচেয়ে যথাযথভাবে বলা যায় ‘বাহ্যিক স্থিতিশীলতার ভেতরে অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের সঙ্কট’।

আগামী দুই-তিন বছরের অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ধারিত হবে রিজার্ভ কত বাড়ল তা দিয়ে নয়; বরং ব্যাংকিং খাত কতটা পরিষ্কার হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা ফিরল, মূল্যস্ফীতি কতটা স্থায়ীভাবে কমলো এবং অর্থনীতি কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারল- তার ওপর।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক নীতির আসল পরীক্ষা।