ডেঙ্গুতে চব্বিশ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮ জনের মৃত্যু
সারা দেশে ভর্তি ১৭৩৩
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত চলতি বছর এক দিনে (২৪ ঘণ্টায়) সর্বোচ্চ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তিও হয়েছে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭৩৩ জন। এর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় এতো বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়ে হাপাতালে ভর্তি হয়নি।
উল্লেখ্য, বৃষ্টির ধরনের পরিবর্তন হওয়ায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটা প্রায় প্রতি বছরই ঘটে থাকে। এ সময়ে সারা দেশেই বৃষ্টির সাথে অনুকূল তাপমাত্রা ও অন্যান্য পরিবেশ থাকে বলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও প্রাথমিক অবস্থায় তাদের কাছে আনা হলে মৃত্যুর হার কমে যায়। কিন্তু অধিকাংশ রোগী ডাক্তারের কাছে দেরিতে আসেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্তের পাশাপাশি কো-মরবিডিটি (ডেঙ্গুর সাথে অন্যান্য অসুস্থতা) থাকার কারণে অনেকের মৃত্যু হয়। দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর যেসব মৃত্যুর তথ্য দিয়ে থাকে সবই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর তথ্য। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর হওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসকের কাছে আসা উচিত। তিনি রোগীকে দেখে কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা দেবেন এবং তা থেকে রক্তের জলীয় অংশের উপস্থিতি অথবা অনুপস্থিতি দেখে চিকিৎসা দেবেন। এ জন্য সারা দেশেই চিকিৎসকদের কাছে ডেঙ্গু চিকিৎসার গাইডলাইন দেয়া আছে। আক্রান্ত হলেই বড় হাসপাতালে না আসলেও চলবে। মোট কথা ডেঙ্গু হলে অপেক্ষা না করে ডাক্তারের কাছে চলে আসতে পারলেই চিকিৎসা সহজ হবে এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।
গত রোববার সকাল ৮টার পর থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আটজনের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে চারজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ৬০ বছরের বেশি বয়সের পুরুষ, ১০ বছরের নিচের এক শিশু, ৬ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত ছয় নারী রয়েছেন। এ নিয়ে দেশে গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট ১৫৭ জনের ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত চলতি মাসের ১৩ দিনে মারা গেছে ৬০ জন। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে সারা দেশে গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট ৫৩ হাজার ৫৭০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন। শুধুমাত্র সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৭২৪ জন। আগের মাস আগস্টের ৩১ দিনে দেশে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। আগস্টে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের।
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে ৩৮৮ জন। ঢাকায় সারা দেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে বলে এখানে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে গতকাল ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে ৩০২ জন ভর্তি হয়েছিলেন। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, রংপুর বিভাগে ৮৬ জন এবং সিলেট বিভাগের হাসপাতালে সাতজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাসপাতালে ১৪৩ জন ও উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হাসপাতালে ১৭০ জন ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে যে ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে কেবল ঢাকা বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৭৯ জনের। এর মধ্যে ডিএসসিসি এলাকার হাসপাতালে ৫১ জন, ডিএনসিসি এলাকার হাসপাতালে ১৯ জন এবং এর বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপর দিকে খুলনা বিভাগে মারা গেছে ২৭ জন, বরিশাল বিভাগে ১২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৬ জন, চট্টগ্রামে বিভাগে ১৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ছয়জন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মোট দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩ জনের মৃত্যু
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুই দিনে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ৫৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৮ জন।
গতকাল মমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
জানা গেছে, বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩ জন পুরুষ, ৪২ জন নারী ও ছয়জন শিশু।
চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২ হাজার ১৭৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বেশির ভাগ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৬৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে মাসজুড়েই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
দুই দিনে মারা যাওয়া তিনজন হলেন- ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাশিদা খাতুন (৪২), গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জাফর আলী (৭০) এবং নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তাসমিনা আক্তার (৪০)।
সিলেটে আরো ৭ ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো সাতজন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৩ জনে। তবে একই সময়ে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন দু’জন।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা: মো: মাহবুবুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত সাতজনের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২, সিলেট উইমেন্স মেডিক্যাল হাসপাতালে ১, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১ এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১ জন রয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে মোট ২৮৩ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে ৫৮, সুনামগঞ্জে ৬২, হবিগঞ্জে ১২৩ ও মৌলভীবাজারে ২৯ জন। এ ছাড়া অন্য জেলা থেকে এসে চিকিৎসা নেয়া ১১ জন রয়েছেন।