সাম্প্র্রতিক সময়ে দেশে যৌন হয়রানির ঘটনা মহামারীর রূপ নিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে; কিন্তু তাদের সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন পর্যন্ত নেই। শুধু দণ্ডবিধিতে দু’টি ধারা আছে, যেখানে নারীর প্রতি অশ্লীল কথা বলা, অশালীন অঙ্গভঙ্গি বা কুরুচিপূর্ণ আচরণের দায়ে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড এবং বলপ্রয়োগ বা অসদাচরণের দায়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান আছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের যৌন হয়রানি রোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নতুন আইনের খসড়ায় যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ পেলে সরকারিভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যবস্থা থাকছে। বিচারে সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী নারী উচ্চ আদালতে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাইতে পারবেন। মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান করা হবে।

খসড়া আইনে যে লঘু শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা সুনামি ঠেকাতে বালুর বাধের মতো। এমন লঘু দণ্ড নির্ধারণ কার্যত সমস্যার গুরুত্ব অস্বীকারের নামান্তর। আর এটিই বড় সমস্যা। যৌন অপরাধকে সবসময়ই ছোট করে দেখা হয় এবং এর বিচারে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় বেশির ভাগ সময় এড়িয়ে যান।

বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে যৌন হয়রানির যত অভিযোগ করা হয় তার মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বিচার হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী বিচার চাইতেই পারেন না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে ১৪২টি, ২০২৪ সালে ১৬৫টি এবং ২০২৫ সালে শুধু জানুয়ারি মাসেই ১১টি।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি এবং অ্যাওয়ারনেস বাংলাদেশের এক জরিপে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী কর্মী জানান, কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ জানালে তাদের কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নেয় না অথবা উপেক্ষা করে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও জেন্ডার প্ল্যাটফর্মের যৌথ গবেষণার তথ্য, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের পর মাত্র ১৮ শতাংশ ঘটনা বিচারের জন্য আদালতে ওঠে। মাত্র ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। বাকি ৯০ শতাংশের বিচার হয় না। এই অবস্থার কারণও স্পষ্ট।

২০০৯ সালে হাইকোর্ট সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিল; কিন্তু সরকার নির্দেশ অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়বদ্ধতায় আনেনি।

বর্তমান সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে ইতিবাচক বলার সুযোগ সামান্যই। খোদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই খসড়ার দুর্বলতার কথা বলেছেন। খসড়ায় ফৌজদারি অপরাধ নয় এমন অনেক অপরাধও ফৌজদারি অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আইন-কানুন সম্পর্কে ধারণা নেই এমন ব্যক্তিরা খসড়া প্রস্তুত করেছেন। পরে যদি সেটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়ও, তবু উদ্যোক্তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

কর্তৃপক্ষের উচিত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে কঠোর ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করা।