যুদ্ধ বন্ধে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ইউক্রেন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র
Printed Edition
আলজাজিরা
দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো একটি আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়ে আজ শনিবারসহ দুই দিনের এ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাইডলাইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার পর জেলেনস্কি এ ঘোষণা দেন। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিল, এ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি তার একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আবুধাবির এ বৈঠককে একটি ‘উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা গ্যারান্টির শর্তাবলি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়েও একটি চুক্তির খসড়া প্রায় প্রস্তুত। জেলেনস্কি এবং ট্রাম্পের মধ্যকার এ আলোচনার পর মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন যে, শান্তি আলোচনার অগ্রগতি এখন একটি মাত্র অমীমাংসিত ইস্যুতে এসে ঠেকেছে এবং এটি সমাধানযোগ্য।
উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইতোমধ্যে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং সেখান থেকে তারা সরাসরি আবুধাবিতে গিয়ে ত্রিপক্ষীয় ‘মিলিটারি টু মিলিটারি’ বা সামরিক পর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপে অংশ নেবেন।
দাভোসে জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাতের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, পুতিনের প্রতি তার স্পষ্ট বার্তা হলো ইউক্রেন যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তবে জেলেনস্কি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, শান্তি আলোচনার পাশাপাশি ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মূল কারিগর এখনো মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন এবং তার জব্দকৃত সম্পদ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে না। এ দিকে শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা ইস্যুটিকে দেখা হচ্ছে, যা নিয়ে জেলেনস্কি গত ডিসেম্বরেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের এ প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানালেও ইউক্রেনের জন্য ক্রমাগত সামরিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, শান্তি আলোচনা চললেও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ হয়নি এবং শান্তি খুব দ্রুত বা ‘আগামীকালই’ আসবে না।
উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহে রুশ হামলায় রাজধানী কিয়েভের প্রায় তিন হাজার ভবন বিদ্যুৎ ও উত্তাপহীন হয়ে পড়েছে এবং ওডেসায় একটি ড্রোন হামলায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয়েছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আবুধাবিতে শুরু হতে যাওয়া এ প্রথম ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি বিশ্ববাসীকে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের মূল ইস্যু ভূখণ্ড
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে এখন একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি-সংক্রান্ত আলোচনা। একই সাথে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কিয়েভের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপের দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপ দুর্বল ও বিভক্ত।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, ‘সবকিছুই জমি বা ভূখণ্ড নিয়ে। এ বিষয়টিই এখনো সমাধান হয়নি।’ তিনি যোগ করেন, ত্রিপক্ষীয় আলোচনা দুই পক্ষকে বিভিন্ন ‘সম্ভাব্য পথ’ বা বিকল্প দিতে পারে। ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনের শিল্পভিত্তিক এলাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব হলো- সেখানে একটি নিরস্ত্রীকৃত ও মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হবে, এর বিনিময়ে কিয়েভকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হবে। উইটকফ বলেন, ‘যদি দুই পক্ষই সমাধান চায়, তাহলে আমরা সমাধান বের করব।’ তিনি জানান, মস্কো সফর শেষে তিনি আবুধাবিতে যাবেন। সেখানে সামরিক বিষয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে কাজ করার জন্য বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ থাকবে।
দাভোসে দেয়া এক বক্তব্যে ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউরোপ দুর্বল ও বিভক্ত। তিনি ইউরোপীয় নেতাদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তারা রাশিয়া, চীন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে খুবই অনিশ্চিত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যেই তর্কে ব্যস্ত, ফলে তারা একসাথে সত্যিকারের বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হতে পারছে না।