ব্যাংকিংয়ে নারী : প্রবেশ আছে, নেতৃত্বে ঘাটতি

৬১ ব্যাংকে নারী কর্মী ১৬.৫১ শতাংশ, উচ্চপদে ১০.৫৫% ও বোর্ডে ১৩.১৪% তরুণীদের প্রবেশ বাড়লেও ক্যারিয়ার সিঁড়িতে সঙ্কট

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির নানা উদ্যোগও রয়েছে। কিন্তু দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক চিত্র দেখাচ্ছে, অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দক্ষতানির্ভর এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যাই নয়, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে নারীর উপস্থিতি আরো দুর্বল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-জুন ২০২৬-এর লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত অর্ধবার্ষিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট ২ লাখ ১৭ হাজার ৮১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নারী ৩৫ হাজার ৯৭১ জন। মোট কর্মশক্তিতে নারীর অংশ মাত্র ১৬.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের প্রতি ১০০ কর্মীর মধ্যে প্রায় ৮৩ জনই পুরুষ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোট নারী কর্মীর সংখ্যা নয়; বরং তারা ব্যাংকের কোন স্তরে অবস্থান করছেন। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে নারীর অংশ ১৬.৯৯ শতাংশ, মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৬.৩৭ শতাংশ, কিন্তু উচ্চপদে তা নেমে এসেছে মাত্র ১০.৫৫ শতাংশে। বোর্ড পর্যায়েও নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৩.১৪ শতাংশ।

এই ব্যবধানই ব্যাংকিং খাতে নারীর জন্য বিদ্যমান ‘গ্লাস সিলিং’-এর ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ নারীরা চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন, কিন্তু ক্যারিয়ারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে কাঠামোগত বাধা রয়ে গেছে।

৩৫ হাজার ৯৭১ নারী কর্মী : গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার ৬১ জন। ছয় মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৭১ জন। অর্থাৎ নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে ৯১০ জন বা প্রায় ২.৬ শতাংশ।

৬১টি ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী কর্মী ৯ হাজার ৪৭১ জন। তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংকে ২ হাজার ৪৫ জন, ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ২৩ হাজার ৫২৪ জন এবং ৯টি বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৯৩১ জন নারী কর্মরত রয়েছেন।

মোট নারী কর্মীর সবচেয়ে বড় অংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। কিন্তু এসব ব্যাংকের মোট কর্মশক্তির মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১৬.১২ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ১৭.০৬ শতাংশ।

অন্য দিকে বিদেশী ব্যাংকে নারী কর্মীর অংশ ২৪.৮১ শতাংশ, যা চার ধরনের ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এসব ব্যাংকে নারী কর্মীর মোট সংখ্যা কম, অনুপাতের দিক থেকে তাদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য।

এখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বিদেশী ব্যাংকগুলো কিভাবে তুলনামূলক বেশি নারী কর্মীকে তাদের কর্মী কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারছে? নিয়োগনীতি, কর্মপরিবেশ, দক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতি, কর্মঘণ্টার নমনীয়তা কিংবা করপোরেট সংস্কৃতির কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য কি এতে ভূমিকা রাখছে- এ নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

তরুণীরা আসছেন, কিন্তু থাকছেন কতজন?

বয়সভিত্তিক তথ্য ব্যাংকিং খাতে নারীর ক্যারিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে আরো বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৩০ বছরের নিচে নারী কর্মীর হার ২১.১০ শতাংশ। ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীর হার কমে ১৬.৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ৫০ বছরের বেশি বয়সে তা মাত্র ১১ শতাংশ।

অর্থাৎ তরুণ নারীরা তুলনামূলক বেশি হারে ব্যাংকিং খাতে প্রবেশ করলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের অংশগ্রহণ কমছে।

এটি ক্যারিয়ার লিকেজের একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত। একজন নারী ব্যাংকারকে নিয়োগ দেয়ার পর তার প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা তৈরিতে প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করে। তিনি মধ্য ক্যারিয়ারে চাকরি ছেড়ে দিলে প্রতিষ্ঠান শুধু একজন কর্মী হারায় না; হারায় প্রশিক্ষণ ব্যয়, অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনাও।

তাই নারী কর্মসংস্থানের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন নারী নিয়োগ পেলেন তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে- কতজন পাঁচ বা দশ বছর পরও প্রতিষ্ঠানে আছেন এবং কতজন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছেন।

টার্নওভারেও সতর্ক সঙ্কেত : ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীদের এম্পøয়মেন্ট টার্নওভারের হার ১৩.৮৭ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ১৬.৩৪ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ১০.৪৫ শতাংশ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১২.৮৫ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি টার্নওভার বিদেশী ব্যাংকে ২৮.৯২ শতাংশ। অর্থাৎ যে ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর অনুপাত বেশি, সেখানেই তাদের কর্মী টার্নওভারও বেশি।

এর কারণ হিসেবে চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার পরিবর্তন, পারিবারিক দায়িত্ব বা কর্মপরিবেশের বিষয় থাকতে পারে। তবে বিদ্যমান তথ্য এসব কারণ নিশ্চিত করে না। তাই নারী কর্মীদের চাকরি ছাড়ার কারণ জানতে ব্যাংকভিত্তিক প্রস্থান সমীক্ষা চালু করা জরুরি।

মাতৃত্বকালীন ছুটি আছে, শিশুযতœ কতটা আছে?

নারী কর্মীদের জন্য সব তফসিলি ব্যাংকেই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর রয়েছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সচেতনতার নীতিও সব ব্যাংকে রয়েছে।

কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কর্মজীবনে নারীর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে শুধু ছুটি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিশুযতেœর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ৩৭টি ব্যাংক নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য একক বা যৌথভাবে শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। অর্থাৎ ২৪টি ব্যাংকে এমন সুবিধা নেই।

এটি শুধু সামাজিক সুবিধার ঘাটতি নয়; এটি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনারও সমস্যা। একজন কর্মজীবী মা যদি নিরাপদ ও সহজলভ্য শিশুযতেœর ব্যবস্থা না পান, তাহলে কর্মক্ষেত্রে তার উপস্থিতি ও ক্যারিয়ার ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অর্থনীতির ভাষায়, এটি ‘পধৎব বপড়হড়সু’-এর অবকাঠামোগত সমস্যা। মাতৃত্বকালীন ছুটি একজন নারীর অধিকার নিশ্চিত করে, কিন্তু শিশুযতেœর ব্যবস্থা তার ক্যারিয়ার ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ায়।

নেতৃত্বের জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি : ব্যাংকিং খাতে নারীর অবস্থান বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নেতৃত্ব। কারণ বোর্ড ও উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের সাথে ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ, বিনিয়োগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এসএমই অর্থায়ন ও করপোরেট গভর্ন্যান্স সরাসরি যুক্ত।

কিন্তু উচ্চপদে নারীর অংশ মাত্র ১০.৫৫ শতাংশ। বোর্ডে ১৩.১৪ শতাংশ।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে বোর্ড পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৪ শতাংশ।

অর্থাৎ নারী কর্মীরা ব্যাংকে প্রবেশ করছেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এটিই নেতৃত্বে পাইপলাইন সমস্যার মূল চিত্র।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও একই সঙ্কট : ব্যাংকের বাইরে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতিও খুব একটা ভিন্ন নয়। সেখানে মোট কর্মীর ১৭.০৫ শতাংশ নারী। প্রাথমিক পর্যায়ে নারী ১৯.৭৬ শতাংশ হলেও মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১২.৮৬ শতাংশ এবং উচ্চপদে মাত্র ৮.৩২ শতাংশ। বোর্ডে নারীর অংশ ১৪.৭৮ শতাংশ।

আরো উদ্বেগজনক হলো, ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র চারটিতে নারী কর্মীদের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান- দুই ক্ষেত্রেই মূল সঙ্কট শুধু নারী নিয়োগ নয়; বরং নারী কর্মীদের ধরে রাখা, পদোন্নতি দেয়া এবং নেতৃত্বে পৌঁছে দেয়া।

অর্থনীতির জন্য ক্ষতি কোথায়?

নারীর কর্মসংস্থানকে কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়লে পরিবারের আয়, ভোগ, সঞ্চয় ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সাথে শ্রমবাজারে দক্ষ মানবসম্পদের সরবরাহ বাড়ে।

ব্যাংকিং খাতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকাররা ঋণ মূল্যায়ন, উদ্যোক্তা নির্বাচন, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক পণ্য নকশায় ভূমিকা রাখেন। ফলে নারী কর্মীর অংশগ্রহণ বাড়লে নারী উদ্যোক্তা ও নারী গ্রাহকদের প্রয়োজন আরো কার্যকরভাবে বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এর জন্য শুধু নারী নিয়োগ বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন মবহফবৎ-ৎবংঢ়ড়হংরাব মানবসম্পদ ও ব্যাংকিং নীতি।

করণীয় : বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের জন্য একটি এবহফবৎ ঊয়ঁধষরঃু ঝপড়ৎবপধৎফ চালু করতে পারে। এতে নারী নিয়োগ, পদোন্নতি, সিনিয়র ব্যবস্থাপনা, বোর্ড, টার্নওভার, মাতৃত্ব-পরবর্তী কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন, শিশুযতœ এবং যৌন হয়রানি সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

নারী কর্মীদের নেতৃত্বে উন্নীত করার জন্য সবহঃড়ৎংযরঢ় ও ষবধফবৎংযরঢ় ঃৎধরহরহম প্রয়োজন। পাশাপাশি পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত মবহফবৎ-ফরংধমমৎবমধঃবফ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নারী কর্মীদের চাকরি ছাড়ার কারণ জানতে নিয়মিত ঊীরঃ ঝঁৎাবু করা উচিত।

শেষ কথা : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর অংশ ১৬.৫১ শতাংশ। কিন্তু উচ্চপদে তা ১০.৫৫ শতাংশে নেমে আসে। বোর্ডে ১৩.১৪ শতাংশ। তরুণ নারীর অংশগ্রহণ ২১.১০ শতাংশ হলেও বয়স বাড়ার সাথে তা কমে ১১ শতাংশে দাঁড়ায়।

এই পরিসংখ্যান একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়- নারীরা ব্যাংকিং খাতে ঢুকছেন, কিন্তু সবাই শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছেন না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি শুধু বৈষম্যের প্রশ্ন নয়। এটি দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা, নেতৃত্ব তৈরি এবং উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন।

তাই নারী কর্মসংস্থানকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটিকে দেখতে হবে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশল হিসেবে।

কারণ অর্থনীতির অর্ধেক সম্ভাবনাকে যদি নেতৃত্বের অর্ধেক দরজা থেকে দূরে রাখা হয়, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কখনোই পূর্ণতা পাবে না।