বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬
মেসির দায়মুক্তির গোল
Printed Edition
তবে কি মিসরকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে? নাকি আটালান্টা স্টেডিয়ামে এই জয়ের ফলে তাদের বহু বছরের প্রতীক্ষার অবসান হলো। নাকি বিশ্বের প্রবল শক্তিধর কোনো দলকে বা প্রচণ্ড রাজনৈতিক শত্রু দেশের বিপক্ষে ফুটবল মাঠে জয়। না- এর কোনোটিই নয়। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ নম্বরে থাকা এবং বর্তমানসহ তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী একটি দল জিতেছে ফিফা র্যাংকিংয়ে ২৫-এ থাকা একটি দলের বিপক্ষে। যাদের সাথে অতীতে হারের কোনো রেকর্ড নেই। তাহলে এই দলটির বিপক্ষে জয়ের পর কেন কাঁদলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। রেফারি যখন খেলা শেষের বাঁশি বাজালেন তখনই মাটিতে বসে কান্না শুরু ছয় বিশ্বকাপ খেলা এই ফুটবলারের। এরপর যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখনো তার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। আসলে এই কান্না জয়ের নয়। স্রেফ দায় মুক্তির। আর্জেন্টিনা যদি মিসরের কাছে হেরে বিদায় নিত, তাহলে মুহূর্তেই মাটিতে নামিয়ে আনা হতো মেসির এত দিনের মান-মর্যাদাকে। সব দোষ চাপানো হতো এই তিন ছেলে সন্তানের জনকের ওপর। কারণ তিনিই মিস করেছেন পেনাল্টি। যে পেনাল্টিতে গোল হলে হয়তো আরো আগেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পেত আলবিসেলেস্তেরা।
পেনাল্টিতে গোল করা এবং গোল মিস করা কোনোটিই বাকি নেই তার। দুই ক্ষেত্রেই রেকর্ড তার দখলে। গ্রুপ ম্যাচেও তিনি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে পরশু যেভাবে মিসর দুই গোলে লিড নিয়ে ম্যাচের লাগাম ধরে রেখেছিল ৮৪ মিনিট পর্যন্ত, এ অবস্থায় বাকি সময়টা পার হলে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেরই পুনরাবৃত্তি হতো। সেবার এই যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে তারা রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে ২-৩ গোলে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল।
আগের ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে দুই দফা লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের গোলে ৩-২-এ জয়। এবার ০-২ গোলে পিছিয়ে থেকেও সেই ৩-২-এ জয়। তবে দুই আফ্রিকান দেশ যেভাবে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনা শিবিরে, তা তারা কখনই ভুলবে না। অবশ্য আরেক আফ্রিকান দেশ ক্যামেরুন তো ইতালির মাঠে তাদের ০-১ গোলে পরাজয়ের লজ্জা দিয়েছিল। এই যুক্তরাষ্ট্রের মাঠেই ১৯৯৪ সালে আরেক আফ্রিকান দেশ নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ১-২ গোলে জিতেছিল দিয়োগো ম্যারাডোনার দল।
আফ্রিকার নেশন্স কাপে রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন মিসরের বিপক্ষে সেরা ১৬-এর এই ম্যাচে মেসি পেনার্ল্টি মিস করলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি মেসিময়ই। ৭৯ মিনিটে ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরোকে দিয়ে গোল করিয়েছেন, যা দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পর লড়াইয়ে ফেরার শক্তি জুগিয়েছে। এরপর ৮৪ মিনিটে নিজে গোল করে দলকে নিশ্চিত হারের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, যা স্কোর ২-২ করে ফেলে। এরপর ৯৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার স্মরণীয় জয়, যা তাদের কানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি করাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের।
মেসি গোল করতে না পারার কারণে ম্যাচে জিততে ব্যর্থ হওয়া বা হার। উভয় ক্ষেত্রেই সব দোষ গিয়েছিল বিশ্বকাপজয়ী এই তারকার ওপর। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ তিনি। এরপর হারের জন্য দায়ী করা হয় তাকেই। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালেও গোল করতে পারেননি। জার্মান কিপার ন্যুয়ারকে একা পেয়েই মেরেছেন বাইরে। এরপর অতিরিক্ত সময়ে পিছিয়ে পড়ার পর সমতায় ফিরতে ফ্রি-কিক পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সবার আশা ছিল হয়তো এই ফ্রি-কিক থেকে গোল করে দলকে লড়াইয়ে রাখবেন মেসি। কিন্তু হলো উল্টো। তার সেই ফ্রি-কিকের শট বারের বহু ওপর দিয়ে গিয়েছিল। এতে রিও ডি জেনেইরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ঘোর শত্রু ব্রাজিল সমর্থকদের হাসির খোরাকে পরিণত হন মেসি।
২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে গোল করেছিলেন। কিন্তু অন্যরা প্রয়োজনীয় গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় হেরেছিল আজেন্টিনা। এর পরও দোষ চেপেছিল মেসির ওপর। কারণ তিনি নির্ধারিত সময়ে কোনো গোল করতে পারেননি। তাই মিসরের বিপক্ষে এই ম্যাচে যদি শেষ পর্যন্ত লিওনেল স্কালোনির দল হেরেই যেত, তাহলে মেসির বিদায় হতো চরম অপবাদ নিয়ে। বিশ্বকাপের মতো তার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শেষ ম্যাচটাও দুঃখ আর বুক চাপড়ানো আফসোস নিয়ে। সব দায় থেকে মুক্তি আর দলকে এখনো শিরোপার রেসে রাখতে পেরেই যেন এই আনন্দের কান্না আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকরের।