সাটুরিয়ায় ঘণ্টায় বিক্রি ৩০০ মণ দুধ
Printed Edition
মো: হুমায়ূন কবীর সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোপালপুর বাজারে প্রতিদিন সকালে বসে দুধের এক বিশাল হাট। মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে এই বাজারে প্রায় ৩০০ মণ দুধ বিক্রি হয়। চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত এলাকা থেকে আসা এই দুধের গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুধ ক্রেতা ও ঘোষেরা এই বাজারে দুধ কিনতে আসেন। তাদের চাহিদা মিটিয়েও এই বাজারের দুধ অন্যান্য পাইকারদের মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম পাড়ের রাজৈর, বরাইদ, ছনকা, কাকরাইদ, নাটুয়াবাড়ি, গালা, কলিয়া, ধুলোটসহ আশপাশের গ্রামের খামারিরা দুধ বিক্রির জন্য খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে গোপালপুর বাজারে আসেন। নদীর পানি কমে যাওয়ায় কেউ কেউ দুধভর্তি সিলভার কলস মাথায় নিয়ে হেঁটে হেঁটে নদী পার হয়ে চলে আসেন গোপালপুর বাজারে। কয়েকটি পথ ধরে সারিবদ্ধভাবে কলস মাথায় হাঁটতে থাকা খামারিদের এই দৃশ্য নদীতীরের প্রকৃতির সাথে মিশে এক মনোমুগ্ধকর সকাল গড়ে তোলে।
প্রতিদিন নিয়ে আসা পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র চাষি ও খামারির দুধ মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। দুধের মানভেদে কেজিপ্রতি দর ওঠানামা করে ৭০ টাকা থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। এ সময় পাইকারদের মধ্যে দুধ কেনার প্রতিযোগিতা চোখে পড়ার মতো। নিয়মিতভাবে ১৫-২০ জন বড় পাইকার এখানে আসেন। কেউ দুধ সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকায় পাঠান, আবার কেউ দুধ থেকে মাখন বা ছানা তৈরি করে রাজধানীর অভিজাত হোটেল ও বাজারে সরবরাহ করেন।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৮০ এর দশকের শুরুতে গোপালপুর বাজারের আশপাশে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বড় বাজার ছিল না। নিজেদের উৎপাদিত ফসল ও গাভীর দুধ বিক্রি করতে কৃষক ও খামারিদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো। এ অবস্থায় ১৯৮৫ সালে বর্তমান বরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো: আব্দুল হাই গোপালপুর গ্রামে কিছু জমি কিনে হাট বসানোর উদ্যোগ নেন। শুরুতে আশপাশের গ্রামের মানুষ সেখানে দুধ ও কৃষিপণ্য বিক্রি করত। পরে ধীরে ধীরে কয়েক গ্রামের মানুষের বেচাকেনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই বাজার।
দুধের ক্রেতা ও পাইকাররা জানান, নদীর ওপারের চরাঞ্চলে গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় সেখানকার দুধের ঘনত্ব ও স্বাদ তুলনামূলক বেশি। তাদের ধারণা, প্রতিদিন এ বাজারে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার দুধ কেনাবেচা হয়।
রাজৈর এলাকার দুধ বিক্রেতা কুলসুম (বয়স আনুমানিক ৬০) জানান, তিনি তিনটি গাভী পালন করেই সংসার চালান। প্রতিদিন ১২-১৫ কেজি দুধ পান তিনি, যা বাজারে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তবে দুধের দামের তুলনায় গোখাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় লাভের অঙ্কটা খুব একটা বেশি না বলে জানান তিনি।
গোপালপুর এলাকার বিক্রেতা হালিম মিয়া (৫০) জানান, তার দুইটি গাভী থেকে প্রতিদিন ২০-২২ কেজি দুধ হয়। পাইকাররা কেজিপ্রতি ৭০ টাকা করে দাম দেন। তার ভাষ্য, এ বাজারে প্রতিদিন ৩০০ মণেরও বেশি দুধ বিক্রি হয়।
দরগ্রাম এলাকার পাইকারি দুধ ক্রেতা জীবন চন্দ্র ঘোষ বলেন, এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মণ দুধ আসে। সকালে হাট বসায় এবং দুধের মান ভালো হওয়ায় অন্য বাজারের তুলনায় এখানে প্রতিযোগিতা করে দুধ কিনতে হয়। আমি প্রতিদিন ২০-২৫ মণ দুধ কিনে ছানা তৈরি করে ঢাকায় বিক্রি করি।
গোপালপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মজিবর রহমান জানান, দুধই এই বাজারের প্রধান আকর্ষণ। বহু বছর ধরে দুধের বাজার হিসেবে সুনাম থাকায় দূরদূরান্ত থেকে পাইকাররা পিকআপ নিয়ে বাজারে আসেন। আশপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গাভী পালন করা হয়। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে আরো বেশি খামারি আসতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন। তবু প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মণ দুধ মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।
এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা: মো: খোকন হোসেন বলেন, গোপালপুর বাজারের এই বিশাল দুধ সরবরাহ স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা গরুর দুধ পুষ্টিগুণে অনন্য। প্রাণীসম্পদ দফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে, যাতে দুধের পরিচ্ছন্নতা ও মান বজায় থাকে। খামারিরা যাতে ন্যায্য মূল্য ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা পান, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে।
তিনি আরো বলেন, সাটুরিয়ার এই দুগ্ধ উৎপাদন শুধু স্থানীয় মানুষকে স্বাবলম্বীই করছে না, বরং রাজধানীর দুগ্ধ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।