হ্যারি কেন নৈপুণ্যে কঙ্গোকে হারাল ইংল্যান্ড
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান মেক্সিকোর
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপের চলমান আসরে এটাই সবচেয়ে বাজে শুরু ছিল ইংল্যান্ডের। কী বিশ্রী অবস্থা। ঘানা ও পানামার ম্যাচের মতোই এর পরিণতি। শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইংলিশদের প্রতিপক্ষ ডিআর কঙ্গো। ম্যাচে দুর্দান্ত শুরু করল আফ্রিকার দেশটি। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের চারজনের পেছন দিয়ে খুবই সহজ একটা বল গেল। জেড স্পেন্স ব্রায়ান সম্পূর্ণ ফাঁকা ছেড়ে দিলেন সিপেঙ্গাকে। আর তিনি সজোরে বলটা জালে জড়িয়ে দিলেন। বাহ। কী দারুণ শুরু! ১-০তে এগিয়ে গেল ডিআর কঙ্গো। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর দীর্ঘ ৬০ বছরে বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করে কোনো ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়তে পারেনি থ্রি-লায়নরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার দেশটির সেই দুর্দান্ত শুরু ধরে রাখতে দেয়নি ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেন। তার জোড়া গোলে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিলো ইংল্যান্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের আটালান্টা স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের আগ পর্যন্ত লক্ষ্যে একটিও শট নিতে পারেনি ইংল্যান্ড। অপর দিকে শুরু থেকেই বলের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করে ডিআর কঙ্গো। এতে সফলতা ম্যাচের ৭ মিনিটে। ইংল্যান্ডের অরক্ষিত রক্ষণভাগের সুযোগ কাজে লাগায় আফ্রিকার দেশটি। অধিনায়ক শানসেল এমবেম্বা অ্যাসিস্টে ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে সিপেঙ্গার দারুণ এক ডান পায়ের শটে বল খুঁজে নেয় জালের একেবারে নিচের বাঁ দিকের কোনা। ঝাঁপিয়ে পড়েও কিছুই করার ছিল না গোলরক্ষক পিকফোর্ডের।
প্রথমে এক গোলে এগিয়ে যেন ভয়ডরহীন ফুটবল খেলছিল কঙ্গো। অপর দিকে গোল হজমের পর কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে ইংলিশরা। ম্যাচের ৩০ মিনিটে প্রথম আক্রমণ ইংল্যান্ডের! শূন্যে ভেসে আসা ক্রস লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে গোলপোস্টের ডান দিকে পাঠিয়েছিলেন জুড বেলিংহাম; কিন্তু কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি রিফ্লেক্স দেখিয়ে বলটি জালে জড়ানো থেকে রক্ষা করেন। ৩৫ মিনিটে ভাগ্যের ছোঁয়া পেল না ইংল্যান্ড। ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়েই প্রথম স্পর্শে গোল অভিমুখে মার্কাস রাশফোর্ড জোরালো শট নিলে কঙ্গোর এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বলটি ব্লক হয়। ৪২ মিনিটে উইসার নৈপুণ্যে ২-০ স্কোর করে ফেলেছিল ডিআর কঙ্গো! এজরি কনসা এবং মার্ক গেহি কেউই পজিশনে ছিলেন না। সেই সুযোগে বক্সের ভেতর অ্যারন ওয়ান-বিসাকা বাড়ানো বল পেয়েই প্রথম ছোঁয়ায় শট নিয়েছিলেন উইসা, কিন্তু বলটি পোস্টের একদম কোনায় লেগে ফিরে আসে!
৪৪ মিনিটে বক্সে পড়ে গেলেন কেন! মাঝমাঠ থেকে বাড়িয়ে দেয়া একটি লম্বা বল তাড়া করে কঙ্গোর বক্সের দিকে ছুটেছিলেন ইংলিশ ফরোয়ার্ড। তাকে রুখতে পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন কঙ্গোর গোলরক্ষক। দু’জনের এই মুখোমুখি লড়াইয়ে বক্সে পড়ে যান কেন। ইংল্যান্ড শিবির পেনাল্টির জোরালো আবেদন তুললেও রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজিয়েছেন উল্টো কেনের বিপক্ষেই! যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবার এমপাসির অতিমানবীয় সেভে হতাশ হতে হলো বেলিংহামকে। শেষ পর্যন্ত ১-০তে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় ইংলিশরা।
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে বেশ চাপ সৃষ্টি করে ইংল্যান্ড। গোলের সুযোগ পায় ম্যাচের ৫৪ মিনিটে। এবারো বাধা হয়ে দাঁড়ালেন এমপাসি। বেলিংহামের শট কঙ্গোর এক খেলোয়াড়ের শরীরে লেগে দিক পরিবর্তন করে ঢুকে যাচ্ছিল জালে। এমপাসি দুর্দান্তভাবেই ঠেকিয়ে দেন বলটাকে। অবশেষে ম্যাচের ৭৫ মিনিটে স্বস্তি ফিরে ইংল্যান্ড শিবিরে। ডান দিক দিয়ে প্রথম আক্রমণটি করেন ডেক্লান রাইস, এরপর অ্যান্থনি গর্ডন আবার বলটা নিজের দখলে নিয়ে বক্সে চমৎকারভাবে ভাসিয়ে দিলে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠালেন হ্যারি কেন।
আবারো ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক! আর কী সুন্দর একটি জিনিস! দলের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে তার কাছেই সমাধান। ম্যাচের ৮৭ মিনিটে বক্সের সামান্য বাইরে গর্ডনের কাছ থেকে বল পেয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের জোরালো শটে সরাসরি জালের উপরের অংশে ঢুকে যায়। দুর্দান্ত খেলা গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না। শেষ পর্যন্ত কেনের জোড়া গোলেই ৬০ বছর আগের ইতিহাস বদলে শেষ ষোলোর টিকিট কাটে ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তিন স্বাগতিকের একটি মেক্সিকোকে পেল ১৯৬৬ আসরের চ্যাম্পিয়নরা।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান মেক্সিকোর
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক মেক্সিকো ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। কারণ তারা তখন বয়সভিত্তিক ফুটবলে বয়স চুরির জন্য ফিফা কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিল। এ ছাড়া ১৯৩৪ সালে ব্যর্থ হয়েছিল কোয়ালিফাই করতে। আর ১৯৩৮ সালে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এই চারটি বছর ছাড়া বাকি সব বিশ্বকাপেরই নিয়মিত প্রতিনিধি এই মেক্সিকো। দেশটির প্রধান খেলা ফুটবল। অথচ ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের এই আয়োজক দেশ কখনই এই আসরের সেমিতে খেলতে পারেনি। দু’বার তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। তা নিজ মাঠে খেলা হওয়ার সুবাদে। ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই মেক্সিকানরা গ্রুপ পর্ব ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেও সেখানেই থেমে যেতে হয়। পরের রাউন্ডে আর যাওয়া হয়নি। এবার ৪০ বছর পর নকআউট পর্বে জয়ের দেখা পেল তারা। ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে তাদের এই প্রতীক্ষার অবসান। ফলে এখন ৪০ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্য ৫ জুলাই তাদের জিততে হবে ইংল্যান্ড ও কঙ্গোর মধ্যকার জয়ী দলের বিপক্ষে।
গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ইকুয়েডর ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে। তাই অনেকেরই ধারণা ছিল মেক্সিকোর বিপক্ষেও তাদের অঘটন ঘটানোর সম্ভাবনা আছে। তবে কিছুই করতে পারেনি ল্যাতিন আমেরিকান দলটি। জুলিয়ান আন্দ্রেস কুইনেনস ও রাউল আলিনস জেমিনেস রদ্রিগুয়েজের গোলে তাদের এই জয়। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে হওয়া এই ম্যাচে স্বাগতিকরা এই দুই গোল পায় ২২ ও ৩১ মিনিটে।
ল্যাতিন আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে শিরোপার জন্য প্রতি বিশ্বকাপেই ফেবারিট থাকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই ইকুয়েডর বাছাই পর্বে কনমেবল জোনে যতই ভালো খেলুক না কেন, মূল পর্বে এলে ওই এবারের সেরা ৩২ ও অন্যবারের দ্বিতীয় রাউন্ডেই ছিটকে পড়তে হয়। আর মেক্সিকোরও দৌড় অধিকাংশ সময়েই ওই পর্যন্তই। তাই এই দুই দলের জমজমাট লড়াই আশা করেছিল সকালে। তবে আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি দর্শকের সামনে কুলিয়ে উঠতে পারেনি ইকুয়েডরিয়ানরা।
মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ার আগুইরে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার দল এবারের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা পারফরম্যান্সই দেখাবে। নিজের মাঠের সুযোগ নিয়ে সে নৈপুণ্যই দেখাচ্ছে তারা। টানা চার ম্যাচেই তাদের জয়। সে সাথে সব ম্যাচেই ক্লিন শিটে জয়। ২২ মিনিটে জুলিয়ান কুইনেনস বক্সের ভেতর থেকে যে কোনাকুনি শট নেন তা ভেঙে দেয় ইকুয়েডর গোলরক্ষকের প্রতিরোধ।
এর ৯ মিনিট পরই ফের আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকানদের উৎসব। এবার প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে ডান পায়ের শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাউল রাহুল জেমিনেজ। বিরতির পর ইকুয়েডর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি। উল্টো ইনজুরি টাইমে তাদের ডিফেন্ডার পেইরো হ্যান্ডকাপিয়ে মুখে হাত রেখে মেক্সিকোর ফুটবলারকে বাজে কথা বলে, এরপর মেক্সিকার ফুটবলারটি রেফারির কাছে নালিশ জানালে ভিডিও রিপ্লে দেখে হ্যান্ড কাপিয়াকে লাল কার্ড দেখান। মুক ঢেকে কথা বলার জন্য দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ‘লাল কার্ড’ পান পেরেইরো হ্যান্ডকাপিয়া।
ইকুয়েডরকে বিপক্ষে মেক্সিকোর এই জয়ের ফলে আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর সফল্যটা অব্যাহতই থাকল। এই স্টেডিয়ামে ৮৯টি ম্যাচের মধ্যে মেক্সিকো হেরেছে মাত্র দু’টি খেলায়। তা ২০০১ সালে কোস্টারিকা এবং ২০১৩ সালে হন্ডুরাসের কাছ হার।