স্বাস্থ্য অধিদফতরে গণবদলি
বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরে গণবদলিকে কেন্দ্র করে। গত ২০ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনে একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভিন্নপর্যায়ের চিকিৎসকদের বদলি করা হয়েছে। অধিদফতর থেকে এসব বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম বলা হলেও, একাধিক চিকিৎসক এর নেপথ্যে আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলেছেন।
চিকিৎসকদের একটি অংশের দাবি, বিশেষ করে এফসিপিএস (ট্রেইনি) চিকিৎসকদের বদলির ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। সাধারণত চার বছরের প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্রেইনি চিকিৎসকদের বদলি করা হয় না। তবে সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে অনেককে মাঝপথে সরিয়ে দেয়ায় তাদের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ট্রেইনি ছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পর্যায়েও পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন জেলায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক নয়া দিগন্তকে জানান, এই বদলির ফলে তারা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং এটি স্পষ্ট ‘হয়রানি’। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হাসপাতালে একাধিক চিকিৎসককে নতুন করে পদায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (স্কালবেস নিউরোসার্জারি) ডা: মো: হাবিবুল্লাহকে রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে বদলি করা হয়েছে। একইভাবে ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ডা: সাদী মাসুদ আল তুরাবকে কুমিল্লায় পাঠানো হয়েছে।
অন্য দিকে, নোয়াখালী থেকে প্যাথলজিস্ট মো: ইমাম হোসেনকে ঢাকা মেডিক্যালে রেজিস্ট্রার হিসেবে এবং ওএসডিতে থাকা ডা: দেবজ্যোতি মজুমদারকে ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগে নতুন করে রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায়ও বদলি হয়েছে একাধিক চিকিৎসকের।
নওগাঁর লেকচারার মো: সোলায়মান আলীকে বগুড়ায়, ডা: নিলয় দাসকে মির্জাপুরে এবং ডা: রফিকুজ্জাহার রেজাকে সিরাজগঞ্জে পদায়ন করা হয়েছে।
এ দিকে, কিছু চিকিৎসক অভিযোগ করেছেন- পূর্ববর্তী সময়ে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়া কয়েকজন চিকিৎসককে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, আর অন্য দিকে সাম্প্রতিক পোস্টিং পাওয়া কিছু চিকিৎসককে পুনরায় সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মতে, এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের ঘন ঘন বদলি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ থাকায় টিকাদান ও চিকিৎসা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
এ দিকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এমন অবস্থায় চিকিৎসকদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করায় চিকিৎসাসেবায়ও বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে যখন সরকারকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে, তখন চিকিৎসকদের স্থিতিশীলভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু চলমান বদলি কার্যক্রমের কারণে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসাসেবায় সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের কিছু শুভাকাক্সক্ষী মনে করছেন, এমন সংবেদনশীল সময়ে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত না হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরো চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সাথে বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকরা বলেন, জুলাই আন্দোলনে একসাথে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছি। আমরা আশা করব বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতি কোনো রকম অন্যায় বা বৈষম্য করা হবে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: জাহিদ রায়হান বলেন, ‘ট্রেইনিদের বদলির বিষয়টি আজই (গতকাল সোমবার) আমার দফতরে এসেছে। এসব অর্ডার দু-চার দিনের ভেতরে হয়েছে।
আমরাই আদেশগুলোতে স্বাক্ষর করেছি। সমস্যা হলো, এগুলোর অধিকাংশই এফসিপিএস ট্রেইনি। এই পদে যোগদানকারীরা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে নয় বরং নিয়মিত হিসেবে করে। আদেশগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য নথিতে তুলতে বলেছি।
যাদের প্রশিক্ষণই সম্পন্ন হয়নি, তাদেরকে অন্যত্র বদলি করা কোনোভাবেই উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, যেখানে ট্রেইনি বিবেচনা হবে না এমন জায়গায় বদলি হলে সেটির বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আর যেখানে হলে সমস্যা হবে না সেখানে সেভাবেই থাকবে।’