মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড়ের মনু মিয়ার মেজাজ-মর্জি দিন দিন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। যত বয়স বেড়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলি বড় হয়েছে তার। আবার বয়োবৃদ্ধতার কারণে চোখ, কান ও কলব ক্রমেই সমন্বয়হীন হয়ে পড়ছে। ইহকাল-পরকাল বিষয়ে তার উপলব্ধি যত বাড়ছে তত তার মনে নিজেকে নিজে মূল্যায়নের প্রশ্ন জেগে উঠছে। একজন অজ্ঞ অশিক্ষিত মানুষের জ্ঞান কাণ্ডজ্ঞান কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব আর মনু মিয়ার মতো এলেম জানা লোকের কাজকারবার এক নয়- এটা তিনি বুঝতে সবে শুরু করেছেন। অজ্ঞ অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ প্রভু নিরঞ্জনের কাছে যে আবেদন নিবেদন করে সেখানে তার বিনয় নিবেদন চিত্ততায় শ্রদ্ধা ভক্তি ভয় অন্যতম অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় আর মনু মিয়ার মতো শিক্ষিত মানুষ যখন কোনো কর্ম সম্পাদন করে তখন তার দায়বদ্ধতা ভিন্নরকম রূপ নেয়। আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তার আলোকে সেই দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। ইদানীং মনু মিয়ার মনে হয় শিক্ষিত হয়ে তার দায়দায়িত্ব বেড়ে গেছে। চোখ থাকতে অন্ধ সাজা তো যায় না। জ্ঞান অর্জনে মানুষের কাছে আল্লাহর প্রথম নির্দেশ ছিল ‘পড়ো’। বলা হলো, তিনি তোমাকে শিখিয়েছেন যা তুমি জানতে না। অতএব জানতে হবে জানার শেষ থাকতে নেই। মনু মিয়া এখনো শিখছে, ঠেকে শিখছে; নানান কায়দায় ও প্রয়োজনে তাকে শিখতে হচ্ছে। এখন সমস্যা হচ্ছে, এই অতিরিক্ত জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করতে গিয়ে, তার অর্জিত ন্যায় ও নীতিজ্ঞান বোধ বিশ্বাসের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাকে নানান বাধা বা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যার জন্য কেউ ভালো কিছু করতে চাইলে সেই সহসা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে, বলছে, ‘আপনি কেন আমাদের জন্য ভালো করতে যাবেন? আপনি সরেন। এভাবে bad money is driving away good money from the market. সত্যম সেবম সুন্দরের একতা ঈমান ও বিশ্বাসের মর্মবাণী প্রচণ্ড অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। সদ্ব্যবহার, সুশাসন, সুনীতি সংস্থানের দুর্নীতি হচ্ছে, সুনীতিকে বিতর্কিত করে দুর্বল করা হচ্ছে তার অবস্থানকে। নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে পড়তে হচ্ছে। সততাই সর্বোত্তম নীতি বা পন্থা, সততা সুশাসনের ধারণা প্রচণ্ড অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পর আগের কিছু বদলায়নি; বরং বদ অভ্যাস বাড়ছে, অর্থনীতির রেজিলিয়েন্স পাওয়ার আরো কমে যাচ্ছে, এসব শুনতে হচ্ছে মনু মিয়াকে। সার্বিক অবস্থা ব্যবস্থা পরিবর্তন বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠার মতো উদাহরণে পরিণত হচ্ছে। চাকরিবাকরি প্রাপ্তিতে বৈষম্য দূরীকরণের সংগ্রামের যে অর্জন, সেখানে মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বৈষম্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ নেয়ার কথা, সে জন্য পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া ছাত্র পড়াশোনায় মন দেবে, দায়িত্বশীল হবে, কারিগরি শিক্ষায় সবাই শুধু সার্টিফিকেটধারী হবে না, কাজের কাজ হওয়ার তাগিদ অনুভূত হতে হবে। যদি সেখানে দেখা যায় লাভের গুড় পিঁপড়া (দুর্নীতি প্রতারণা) খেয়ে ফেলছে।
আবহমান বাংলায় বড় হওয়া মনু মিয়া বাল্য কৈশোরকালে বর্ষার পানিতে আবেগ আপ্লুত হতো, বৃষ্টির টাপুর-টুপুর কিংবা টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তাকে উদ্বেলিত করত কিংবা আরো কিছুকাল পরে, ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের জল ধুয়ো না’ জাতীয় সুরের মূর্ছনায় মেতে উঠত। আবার ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’-এর মতো বয়স পেরিয়ে মনু মিয়ার কাছে বৃষ্টি এখন কেন জানি আপৎ মনে হয়। বছর ছয়েকের মতো তার পরিবার জাপানে থাকার সময় সেখানকার বৃষ্টিকে তার ছন্দহীন কর্কশ মায়া মমতাবিহীন মনে হতো। তার কাছে ভাবলেশহীন জাপানিদের পুতুলের মতো মনে হতো। এখন এই বয়সে এই বাংলায় বৃষ্টিকে আর আপন মনে হয় না। মেঘ মল্লার রাগ তার মনের তানপুরায় নতুন সুর ভাজে না। বৃষ্টি এখন জলাবদ্ধতা দুর্গন্ধ স্থায়িত্বের আকর মনে হয়।
বৃষ্টি তার কানে আধুনিককালে বড় বেমানান ঠেকে। আগে গানের মধ্যে মেলোডি খুঁজে পেতে কষ্ট হতো না। এখন ডিফারেন্ট টাচের ‘শ্রাবণের আকাশে’ গান বাজলে বৃষ্টি আসার মতো কাকতালীয় ঘটনা ঘটে না। মুহম্মদ রফির রাখে ওয়ালে গানের সাথে পাথর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে না। মনু মিয়ার মনোজগতে অতৃপ্তিবোধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফরিদা পারভীনের গান কিংবা মোহরদি (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) রবীন্দ্র সঙ্গীতের বাইরে তাকে আর টানে না। মসজিদের ইমাম সাহেব যখন খালি গলায় তিলাওয়াতের মূর্ছনা সৃষ্টি করেন, তখন তাতে বিমোহিত হয়ে যান মনু মিয়া। ঐশ্বরিক টান ভাবনায় চলে আসে, যেটা তার মনে আগে আসত না।
মনু মিয়া মানুষের উপকার ছাড়া ক্ষতির কারণ কখনো হননি। প্রশাসনিক শৃঙ্খলার কারণে বিধিবিধানের প্রয়োগকালে কতিপয় কর্মীর সাথে কচিৎ মনোমালিন্য হয়েছে তার কিন্তু যখন দেখেন অন্যের প্ররোচনায় বিশালসংখ্যক সহকর্মী যখন তার নামে বদনাম রটায়, রক্তচক্ষু বিস্ফোরণ ঘটায় তখন মনু মিয়া নিজেকে ধিক্কার দেন, কেন এমন হয়। বারবার তার মনোজগতে বেদনাবোধের যখন সঞ্চার হয় তখন তিনি সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পান সাধক ব্যক্তিত্ব খানবাহাদুর আহছানউল্লাহর কয়েকটি ভক্তের পত্রে-
‘‘দয়াময়ের অফুরন্ত দয়া তোমার উপর বর্ষিত হইয়াছে। সর্ব্বদা শোকর গোজার থাকিবে ও তাঁহাতেই আত্মসমর্পণ করিয়া মোস্লেম নামের গৌরব রক্ষা করিবে। পদে পদে তিনি হাত ধরিয়া অগ্রসর করাইতেছেন, প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসে তাঁহাকে ইয়াদ করিতে থাকিবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে ও স্বীয় ক্ষুদ্রত্ব জ্ঞাপন করিয়া দয়া ও এহছান ভিক্ষা করিবে। সবল থাকিতে ইয়াদ করাই বান্দার একান্ত কর্তব্য। যখন যৌবন-সুলভ প্রবৃত্তিগুলি তোমাকে আকর্ষণ করিয়া কেন্দ্র হইতে চ্যুত করিতে চায়, তখন নিভৃতে তাঁহারই শরণাপন্ন হইয়া ক্ষমা ভিক্ষা করিবে।
চিন্তাময়ই চিন্তা করিবেন, আমরা কেন তাঁহার চিন্তা লইয়া আপনাকে ব্যথিত করি? জন্ম-মৃত্যু উভয়ই তাঁহার দান, কোনটি ক্ষুদ্র কোনটি মহৎ, কে তাহা বুঝিবে? যে যেভাবে আসে আসুক, আমরা সৃষ্ট হইয়া স্রষ্টার কাজে কেন কটাক্ষপাত করিব? তিনি স্বীয় বিবেচনা লইয়া কাজ করিবেন, আমাদের বুদ্ধি লইয়া নহে। যখন তাঁহাকে ন্যায়বান ও দয়ার আধার মনে করি, তখন আবার স্বীয় বিচার-বুদ্ধিকে কেন প্রশ্রয় দেই?
সমস্ত মন-প্রাণটি দিয়া মহাপ্রভুর উপর নির্ভর করিতে পারিলে কোনো উদ্বেগ থাকে না। আমরা যখন সমস্ত আমিত্ব খরচ করিয়াও উদ্ধার না পাই, তখনই তাঁহাকে নির্ভরের ভান করি। ইহা প্রতারণা ব্যতীত আর কিছুই নহে। তাঁহাকে প্রতারণা করিতে গিয়া নিজেই যে প্রতারিত হই, তাহা বুঝি না। তিনি যে রাজ্জাক, আমরা তাহা বুঝি কই? লাখ লাখ পক্ষীর খোরাক যিনি জোগান, তিনি কি জীবশ্রেষ্ঠ মানবের খোরাক জোগাইতে নারাজ? আমরা নিজের ভার নিজে লইয়া অভাব খরিদ করিয়া লই, ইহার তো কোনো ঔষধই নাই।
অভাবের মধ্যে বেশ আছি- আমি দরিদ্র হইয়াও ধনী, দুঃখের মধ্যেও বেশ সুখী, চিন্তার মধ্যেও বেশ সুস্থির। আমি চির-ব্যাধিগ্রস্ত হইয়াও এই ভীষণ বর্ষামধ্যে, গলিত আবর্জনার মধ্যে কিরূপে আমার দেহ এখন অনাক্রান্ত আছে, তাহা চিন্তার পরিধির বহির্গত।
মানবের সহানুভূতি পাইলাম না, দেখি, বন্য জীবের সখ্যতা লাভ করিতে পারি কি না। ‘পিউ কাঁহা’ পাখীর অন্বেষণে ছুটিব, দেখি তাহা দ্বারা ‘পিয়ার’ অনুসন্ধান পাই কি না। কতটা বৎসর অতিক্রম করিলাম, একবার পরাণ ভরিয়া তাহাকে আলিঙ্গন করিতে পারিলাম না। তাই, যারা তাকে ব্যতীত আর কিছুই জানে না, তাদের পথের পথিক হই।
আমরা অশান্ত, ব্যাকুলতাই আমাদের একমাত্র সম্বল নিজে হাসি, নিজে কাঁদি-পরাণটি রাখিবার স্থান পাই না। তাই প্রাণেশ্বরের সেবা লইতে পরাণ উধাও হইয়াছে, একবার ছুটিব, একবার ঝাঁপ দিব; যেখানে মানুষের যাতায়াত নাই, সেখানে দারুণ বিপিনের নির্জনতার মধ্যে তাঁহার সন্ধান লইব। সংসারের কৃত্রিমতা মনকে ক্রমেই বিকর্ষণ করিতেছে, পথ দেখি না, যাই কোথায়? আমার বলিতে কে আছে? সাড়া কবে আসিবে? আর তো দিন নাই, তাই চক্ষু বন্ধ করিয়া একবার ছুটিব, দোওয়া করিবে, যেন পিয়ার সহিত পরাণের আদান-প্রদান করিতে পারি।
হৃদয়টি ভরিয়া ভালোবাসিতে থাক, হিংসা ও দ্বেষ-পুষ্ট আগাছাগুলি অন্তঃকরণ হইতে উপড়াইয়া ফেল, সহযোগিতার শৃঙ্খলে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বন্ধন করিয়া একযোগে প্রেমময়ের সান্নিধ্য হাছেল কর, তবেই সংসার বেহেশতে পরিণত হইবে এবং স্বর্গীয় শান্তির অধিকারী হইবে। মনে রাখিবে, প্রেমিকের পরীক্ষা অতি কঠিন। যে পর্যন্ত হৃয়দখানি দ্রবীভূত না হইবে, সে পর্যন্ত পরীক্ষা নানা আকারে আসিতে থাকিবে। গ্রহণের পূর্ব্বে প্রেমময় প্রেমিককে বেশ যাঁচিয়া লন। তাই বলি, প্রেমে গলিয়া জল হইয়া যাও, দৃষ্পবৃত্তিগুলিকে খায়েরবাদ কর, স্বার্থের গণ্ডি ভাঙ্গিয়া ফেল, ভাইয়ে ভাইয়ে বুকে বুকে মিলিয়া যাও, তোমাদের আদর্শ দেখিয়া জগৎ শিক্ষা লাভ করুক ও তোমরা অমরত্ব লাভ কর।
কথাবার্তায় দীনতা এখতেয়ার করা মহত্ত্বের পরিচয়। অন্তঃকরণ যতই কোমল হইবে, বাক্যের কঠোরতা ততই কমিবে। কর্কশ ভাষা অহংভাবের পরিচায়ক। নামাজী হইয়া রুক্ষভাষী হওয়া, অপরকে হেয় মনে করা, ক্রোধ ও মিথ্যার আশ্রয় লওয়া, বড়ই কলঙ্কের কথা। যে অপর মানুষের নিকট ছের ঝুঁকাইতে না পারে, সে খোদার দরবারেও দেল ঝুঁকাইতে পারে না। যে ছেজুদাতে দেল না ঝোঁকে, সে ছেজদা প্রেমময় কবুল করেন না। প্রকৃতপক্ষে আমরা দুষ্পবৃত্তিকে ছেজদা করিয়া শেরক্ করিয়া থাকি, খোদার নিকট প্রকৃতপক্ষে মাথা নত করি না। ভিতর বাহিরে এক না হইলে, মোনাফেকী হয় এবং উহার সাজা অতি কঠিন। প্রেমিকের ত্রুটি পদে পদে, তাই বলি, নির্জনে বসিয়া আত্ম-পরিচয় লইবে ও প্রেমময়ের তুষ্টির জন্য তনু-মন-জন পরিত্যাগ করিতে সর্ব্বদা প্রস্তুত থাকিবে। স্বীয় ক্ষুদ্রত্ব সর্ব্বদা স্মরণ রাখিয়া মহাদরবারে করুণা ভিক্ষা করিবে-সিক্ত-নয়নে, যুক্ত করে, তপ্ত-বক্ষে। অপরের দোষ অনুসন্ধান করিবে না, নিজের মনকে বাঁধিয়া রাখিবে-কোপ, ঈর্ষা, অভিমানকে গণ্ডির মধ্যে আসিতে দিবে না, অভাবে বিচলিত হইবে না, দারিদ্র্যকে ফখর মনে করিবে, রাত্রিকালে অপরের অলক্ষ্যে প্রিয়তমের নিকট প্রার্থনা পেশ করিয়া ক্ষমা ভিক্ষা করিবে, অশ্রুকে সম্বল করিবে, প্রতি নিশ্বাস-প্রশ্বাসে মাহবুবকে স্মরণ করিবে, বা-ওজু থাকিতে চেষ্টা করিবে, আহার ও নিদ্রা পরিমিত করিবে, বৃথা বাক্য-ব্যয় করিবে না, অন্তর্দৃষ্টি করিবে, ব্যথিতের ব্যথা দূর করিবে, প্রেমের শৃঙ্খলে ক্ষুদ্র মহৎ সকলকে আবদ্ধ করিবে, সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিবে, মুছিবতকে মঙ্গলপ্রসূ মনে করিবে, মঙ্গলময়ের সকল দান স্মিতমুখে গ্রহণ করিবে।’’
লেখক : অনুচিন্তক