হালুয়াঘাটে ইউপি ভবন সংস্কার না করেই ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন
Printed Edition
সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ অফিস
সরকারি অর্থ বরাদ্দ, কাগজে-কলমে সংস্কারের প্রস্তুতি, কিন্তু বাস্তবে ভবনের দেয়ালে নেই নতুন রঙের আঁচড়ও। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন সংস্কারের নামে কাজ না করেই ৬০ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, ভবন সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ তুলে নেয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজই হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধারা, ধুরাইল, কৈচাপুর ও গাজীরভিটা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনগুলোর দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে, রঙ বিবর্ণ, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, শৌচাগারগুলো ব্যবহার অনুপযোগী এবং পানির কলগুলোও অনেক স্থানে অকার্যকর। অথচ এসব ভবন সংস্কারের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিটি ইউনিয়নের নামে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী জুন মাসের মধ্যেই সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অর্থবছর শেষ হলেও কাজ হয়নি। সরকারি বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ না হলে বরাদ্দের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও সেটিও হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে; তাহলে ৬০ লাখ টাকা গেল কোথায়?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সংস্কার না করেই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। ধারা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, ভবনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সংস্কারের জন্য বরাদ্দের কথা শুনলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন আহমদ জানান, সংস্কারের প্রয়োজন আছে কিন্তু অর্থবছর শেষ হলেও কাজ শুরু হয়নি। ধুরাইল ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, সংস্কারের কোনো কাজ তিনি দেখেননি। যদি কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তবে তা গুরুতর অন্যায়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং ভবন সংস্কারের দাবি জানান।
কৈচাপুর ও গাজীরভিটা ইউনিয়ন পরিষদেও একই চিত্র দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সেখানে কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। একইভাবে স্বদেশী ও জুগলী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেও সংস্কারের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ প্রথমে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তিনি দাবি করেন, বর্ষাকালে রং করলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সংস্কার কাজ শুরু করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে বরাদ্দের অর্থ ‘পে-অর্ডার’ করে রাখা হয়েছে। তবে এ সময় উপস্থিত উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন ইউএনওকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, “স্যার বলেন, সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।” এরপর ইউএনওও বলেন, সংস্কার কাজ চলমান এবং ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ইউএনওর বক্তব্যের সূত্র ধরে সরেজমিনে একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ ঘুরেও কোথাও কোনো ধরনের চলমান সংস্কার কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বাসিন্দারাও এমন কোনো কাজের বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি।
এ ঘটনায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কাজ ছাড়া বিল উত্তোলনের অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয় বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধ। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক।