বাংলাদেশ যখন পূর্ব-পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ ছিল তখন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল খুব বৈরী। সে সময় পূর্ব-পাকিস্তানের সাথে ভারতের বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের কঠোর মনোভাবে দু’দেশের মধ্যে চোরাচালানও ছিল শূন্যের কোঠায়।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের স্থল সীমানা চার হাজার ২৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে মিয়ানমারের সাথে ২৭১ কিলোমিটারব্যাপী স্থলসীমানা আছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর রাতারাতি ভারতের সাথে আমাদের বাণিজ্য বাড়ে। তবে এই বাণিজ্য একমুখী। প্রতি বছর বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্য বাড়ছে; কিন্তু ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, সে তুলনায় রফতানি নগণ্য। বিগত বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার পণ্য। অন্য দিকে রফতানি ছিল ২১ হাজার কোটি টাকার পণ্য। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতে যে পরিমাণ পণ্য রফতানি করে তা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব; কিন্তু ভারতের রাজ্য সরকারগুলোর নেতিবাচক ভূমিকায় বাণিজ্য বৃদ্ধি প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতের এমন অনেক রাজ্য আছে যা বাংলাদেশের জন্য বাজার পাওয়ার উপযোগী। কিন্তু যখনই বাংলাদেশের বিশেষ কোনো পণ্য ভারতের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে; তখন দেশটির বিভিন্ন রাজ্য সরকার অশুল্ক বাধা আরোপ করে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে স্বদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তা ছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য রফতানিরত সে দেশের মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যে সনদ দেয়; তা কোনো ধরনের প্রশ্ন না তুলে বাংলাদেশ সচরাচর নিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের পণ্য ভারতে রফতানিতে আমাদের মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সনদ গ্রহণ না করে সে দেশের শুল্ক কর্তৃপক্ষ রফতানিকৃত পণ্যের নমুনা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠায়। এই প্রক্রিয়ায় ১০-১৪ দিন সময় অযথা নষ্ট হয়। এ কারণে সেখানকার বাজারে আমাদের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সেই সাথে পচনশীল পণ্যে সময়ক্ষেপণে পচন রোধ এড়ানো অনেক সময় দুরূহ হয়ে ওঠে।

যেকোনো দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সে দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষের মৌলিক চাহিদা— অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী ধারা যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হয়।

ভারত বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী দেশ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেসব অমীমাংসিত সমস্যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বিরাজমান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— অভিন্ন নদীগুলোর সুষম পানি বণ্টন, বাণিজ্যবৈষম্য দূরীকরণ, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বৈরী মনোভাব প্রত্যাহার, ফেনসিডিলের মতো মাদকসহ সবধরনের পণ্যের চোরাচালান রোধ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ভারতের মধ্য দিয়ে ভুটান ও নেপালে ট্রানজিট সংযোগ স্থাপন, অচিহ্নিত স্থল ও সমুদ্রসীমানা চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় ভূমি হস্তান্তর। উপরোক্ত সমস্যাগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমানা চিহ্নিতকরণ ও ছিটমহল বিনিময় নিষ্পত্তি হয়েছে।

ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সেভেন সিস্টার্সে যেতে স্থল, নৌ ও রেলপথে দীর্ঘদিন ধরে ট্রানজিট সুবিধা পেতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিল। বিনিময়ে ঢাকা অব্যাহতভাবে বলে আসছিল ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা স্থাপন। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন সময়ে এক দেশ অন্য দেশকে পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট নাকি করিডোর সুবিধা দেবে— এই বিতর্ক চলে আসছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সের কানেকটিভিটি দেয়া হবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের মধ্য দিয়ে ভুটান ও নেপালের সাথে কানেকটিভিটির সুযোগ পাবে। এ ধরনের কানেকটিভিটি স্থাপন করা হলে চারটি দেশের যানবাহন এক দেশের ভেতর দিয়ে অন্য দেশে চলাচল করবে। নিঃসন্দেহে এই যোগাযোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক; কিন্তু এ ধরনের যোগাযোগে পর্যাপ্ত শুল্ক দেয়ার বিধান না থাকলে সড়ক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হবে; তা নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

ভারত কানেকটিভিটি সুবিধা ছাড়াও সেভেন সিস্টার্সের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আসছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যথাযথ শুল্কের বিনিময়ে এ ধরনের ব্যবহার উভয় দেশের স্বার্থের অনুকূল।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে নৌ-ট্রানজিট আছে তা অভিন্ন নদীগুলো নাব্যতার অভাবে পুরোপুরি বছরব্যাপী কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ জন্য নদীগুলোতে ব্যাপকভাবে খনন প্রয়োজন; কিন্তু পণ্য চলাচলে বাংলাদেশ যে শুল্ক পায় তা কোনোভাবে ড্রেজিং ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উভয় দেশ আনুপাতিক ভিত্তিতে ড্রেজিং ব্যয় মেটানোর দায়িত্ব নিলে সমস্যাটি সমাধানের পথ প্রশস্ত হবে।

২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফর করেছিলেন তখন বাংলাদেশকে স্বল্প সুদে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ঋণটি শর্তযুক্ত ঋণ ছিল। তাতে উল্লেখ ছিল, প্রকল্প সংশ্লেষে বহির্দেশ থেকে যেসব কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ও সেবা নিতে হবে তার ৮০ শতাংশ ভারত থেকে নিতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সফরের সময় দুই বিলিয়ন ডলারের আবদ্ধ ঋণচুক্তি আগের ঋণের শর্তে স্বাক্ষরিত হয়। উভয় ঋণের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে রেল এবং সড়কপথ সংস্কার ও নির্মাণ, নৌ ও সমুদ্রবন্দরের জেটি সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীর নাব্যতা বৃদ্ধিকল্পে নদী খননে যে অর্থ ব্যয় হবে; তাতে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থ বেশি রক্ষিত হবে। তা ছাড়া উভয় ঋণের আওতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলাচলে ভারতে নির্মিত বাস সরবরাহের উল্লেখ আছে। এর মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ যতটুকু না লাভবান হবে তার চেয়ে বেশি লাভবান হবে সে দেশের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে ভারত দাবি করে আসছিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের বিভিন্ন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অনুরূপ বাংলাদেশও দাবি করে আসছিল, বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারতে আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ বিষয়ে উভয় দেশের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সম্পূর্ণ যে সুরাহা হয়েছে এমন কথা বলা যাবে না।

ফেনসিডিল উৎপাদন ১৯৮২ পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া পরবর্তী অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের চার পাশে ভারতীয় ভূমিতে ১৫০টির মতো মাদকসম ফেনসিডিল উৎপাদন কারখানা গড়ে ওঠে। প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশে দুই-তিন লাখ বোতল ফেনসিডিল পাচার হয়ে আসে, যার মূল্যমান বাংলাদেশী মুদ্রায় চার-ছয় কোটি টাকা। বছরের হিসাবে এর মূল্যমান দাঁড়ায় ১৪৬০-২১৯০ কোটি টাকা। সীমান্তসংলগ্ন কারখানাগুলো শুধু বাংলাদেশে প্রেরণে ফেনসিডিল উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে, এ নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা উদ্বিগ্ন হলেও ভারত সম্পূর্ণরূপে নির্বিকার।

ভারত সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক দেশ এবং সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলনে বিজয় নির্ধারিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো— বাংলাদেশসহ ভারতের প্রতিবেশী সব দেশে তারা সবসময় সম্পূর্ণরূপে তাদের স্বার্থের অনুকূল এমন সরকার দেখতে চায়। আর তাই ভারতের অবৈধ প্রভাবে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশে জাতীয় নির্বাচন কলুষিত হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। ভারত প্রকৃতই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলে নিজের ও প্রতিবেশীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমগুরুত্ব দিয়ে অবশ্যই উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এ ধরনের উদারতা দেখাতে ভারত ব্যর্থ হয়েছে।

অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ থেকে কর্মজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের কর্ম ও শ্রমলব্ধ অর্থ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও কম সমৃদ্ধ দেশে প্রেরিত হয়; কিন্তু বাংলাদেশের সাথে ভারতের ক্ষেত্রে তা উল্টো। ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ভারতীয়রা বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত থেকে যে পরিমাণ অর্থ সে দেশে পাঠায় তা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। এ বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশ থেকে সে দেশের কর্মজীবী মানুষের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে তা তাদের পঞ্চম বৃহত্তম। অনুরূপ বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ভারত যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে তাও দেশটির পঞ্চম বৃহত্তম।

ভারত থেকে প্রতি বছর চোরাচালানের মাধ্যমে যে পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে ঢোকে তার মূল্যমান হিসাব করে বলা কঠিন হলেও অর্থনীতিবিদদের ধারণা— ছয় হাজার কোটি টাকার কম নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশীরা ভ্রমণ, চিকিৎসা, কেনাকাটা ও পড়ালেখা সংশ্লেষে ভারতে গিয়ে যে অর্থ ব্যয় করেন, অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা— তার পরিমাণও ৩০ হাজার কোটি টাকার কম হবে না। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারত প্রতি বছর বিভিন্ন খাতে যে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে তা স্বাধীনতাপূর্ব শূন্যের কোঠায় ছিল।

ভারতের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্র প্রতিবেশী বাংলাদেশ দ্বারা সব দিক দিয়ে লাভবান হচ্ছে। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, তার কি উচিত নয়, বাংলাদেশ যাতে দ্রুত উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করে অর্থনৈতিকভাবে সবধরনের বাধা অতিক্রম করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, সে দিকে নজর দেয়া? আমরা ভারতের সরকারগুলোর এরূপ নজর দেয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করিনি।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

iktederahmed@yahoo.com