জৈব সারে বদলাচ্ছে গ্রামীণ নারীর জীবন
Printed Edition
হারুনুর রশিদ রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
একসময় গোবর নিয়ে কাজ করায় গ্রামের মানুষের কৌতূহল ও উপহাসের মুখে পড়তে হয়েছিল রোকসানা আক্তার রেহানাকে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতেন, গোবর দিয়ে কী হবে? সেই গোবর থেকেই আজ উৎপাদিত হচ্ছে মানসম্মত ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার), যা স্থানীয় কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একইসাথে তার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন অনেক গ্রামীণ নারী।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের ঝাউডগী গ্রামের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার রেহানা। গৃহিণীর পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি এখন একজন নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা রোকসানা নিজ বাড়িতে পরীক্ষামূলকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে তার উদ্যোগ শুরু করেন। রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব সারের ব্যবহার জনপ্রিয় করতে গিয়ে শুরুতে নানা বাধার সম্মুখীন হন। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় কৃষকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তার উৎপাদিত জৈব সার এলাকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিজের উদ্যোগকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি গ্রামের নারীদের নিয়ে কৃষক দল গঠন করেছেন। উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে নারীদের সম্পৃক্ত করে কৃষি, সেলাই ও কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করছেন। তার উদ্যোগে অনেক নারী নিজস্ব আয়ের পথ তৈরি করেছেন।
এ ছাড়া বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে বিষমুক্ত সবজি চাষে নারীদের উদ্বুদ্ধ করছেন রোকসানা। এতে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে বাড়ছে পারিবারিক আয়। একইসাথে কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করে নিরাপদ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে ভূমিকা রাখছেন তিনি।
নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সহযোগিতায় ৩০ সদস্যের একটি নারী দলও গঠন করেছেন রোকসানা। প্রকল্পের আওতায় সদস্যদের ছাগল পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং শেড নির্মাণে সহায়তা দেয়া হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারী নারীরা বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছেন।
রোকসানা আক্তার রেহানা বলেন, ‘শুরুতে অনেকে আমার কাজ নিয়ে হাসাহাসি করতেন। এখন মানুষ জৈব সারের উপকারিতা বুঝতে পারছেন। অনেকেই এই সার ব্যবহার করছেন, আবার উৎপাদনেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
তিনি জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর শরীফের পরামর্শ ও সহযোগিতা তার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রোকসানার উদ্যোগ শুধু একজন নারীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি গ্রামীণ নারীর আত্মনির্ভরশীলতা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণের একটি বাস্তব উদাহরণ। স্থানীয়ভাবে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে তার এই উদ্যোগ রায়পুরে ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।