সূচকের বড় পতনেই সপ্তাহ শেষ করল পুঁজিবাজার
দর হারালো ৮০ শতাংশ কোম্পানি ও ফান্ড
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তি মিলছে না। নির্বাচনপরবর্তী সূচকের বড় উত্থানের ফলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল নতুন সরকার গঠনের পর গত তিনদিনের বাজার আচরণ তাতে যেন পানি ঢেলে দিল। সপ্তাহের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কর্মদিবসে সূচকের অবনতিকে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেয়ার অংশ হিসেবে সংশোধন বলে দেখলেও গত দু’দিনের বাজার আচরণ তাদের মাঝে নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিলো। বুধবারের ৫১ পয়েন্টের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটি হারাল ৫৩ দশমিক ৩০ পয়েন্ট। এভাবে বড় পতন দিয়েই সপ্তাহ শেষ করল পুঁজিবাজার।
পুঁজিবাজারের স্টেক হোল্ডাররা বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসাবে দেখলেও এ ক’দিনের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করতে শুরু করেছে। তারা মনে করছে, দেশে নতুন একটি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে যারা অতীতে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তাই অন্তত কয়েকটা দিন বাজারের ভালো আচরণ করাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ পৃথিবীর সব দেশেই এমনকি আমাদের পাশর্^বর্তী দেশগুলোতেও পুঁজিবাজারবান্ধব কোনো সরকার আসলে বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু এখানে নির্বাচনের পরদিন বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত দিলেও পরদিন তা টিকে থাকল না। পরদিন থেকে বাজারে বিরামহীন বিক্রয়চাপ শুরু হলো যার ফলে টানা চার দিন ধরে পুঁজিবাজার সূচকের ধারাবাহিক পতন।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি গতকাল ৫৩ দশমিক ৩০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বৃহস্পতিবার সকালে পাঁচ হাজার ৫১৯ দশমিক ১৩ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৬৫ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১২ দশমিক ১৬ ও ১০ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৭৯ দশমিক ৯২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৮৬ ও ৩৪ দশমিক ১৩ পয়েন্ট।
গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকায় লেনদেনের শুরুতেই প্রধান সূচকটির প্রায় ১০ পয়েন্ট হারিয়ে বসে ডিএসই। পরে চাপ কিছুটা হ্রাস পেলে সূচকটি ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ১১টার পর ডিএসই সূচকটি পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪৩১ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১২ পয়েন্ট। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন করে বিক্রয়চাপ শুরু হলে ডিএসই সূচক নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৯৪ পয়েন্টে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চাপ সামলে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচকটি। বেলা ১২টায় সূচকটি আবার পাঁচ হাজার ৫২৬ পয়েন্টে। এখান থেকেই বড় পতনের শুরু। দিনের বাকি সময় বিক্রয়চাপের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচকের পতন আরো ত্বরান্বিত হলে দিনশেষে বড় ধরনের অবনতির শিকার হয় ডিএসই।
দিনের বাজার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনের পরদিন বাজার যে ইতিবাচক আচরণ করেছিল তা খুবই স্বাভাবিক ছিল। একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে পুঁজিবাজার আচরণে কমবেশি পরিবর্তন আসবে। সে হিসাবে শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু গত কয়েক দিন বাজারে যে ধারাবাহিক পতন ঘটছে তা নিয়ে খুব একটা শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অনেক সময় নতুন করে বাজারে বিনিয়োগের পরিকল্পনার অংশ হিসাবেও এমনটি ঘটতে পারে। হয়তো আগামী সপ্তাহেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে পুঁজিবাজার।
তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ গত কয়েক দিনের বাজার আচরণে বেশ অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, অতীতে বিএনপি সরকারের হাতেই পুঁজিবাজারের সংস্কার হয়েছে। এখন এই দল ক্ষমতায় আসার পর বাজার আচরণ আরো ইতিবাচক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু একদিন সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও গত চার দিন টানা পতন ঘটলো সূচকের।
এ দিকে গতকাল লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলো ৮০ শতাংশই দরপতনের শিকার হয়। সবগুলো খাতের বেশির ভাগ কোম্পানিই ছিল পতনের তালিকায়। ব্যাংকিং খাতে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া অন্যগুলো দর হারায়। বেশ কয়েকটি খাতে দরপতন ঘটে শতভাগ কোম্পানির। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৪৬টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৩১৩টি। অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৮২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪৩টির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, ১১৯টি দর হারায়। অপরিবর্তিত থাকে ২০টি সিকিউরিটিজের দর।
গতকাল ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ২৭ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকায় আট লাখ ৫১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল ছিল দিনের দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ঢাকা ব্যাংক, সায়হাম কটন মিলস, প্রগতি লাইফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ওরিয়ন ইনফিউশন, রহিমা ফুড করপোরেশন, মুন্নু ফেব্রিক্স ও সিটি ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল রহিমা ফুড করপোরেশন। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ। ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড। ডিএসই’র মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, এপেক্স স্পিনিং, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, ইসলামী ব্যাংক, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি থাই ফুড ও ব্র্যাক ব্যাংক।
দিনের দরপতনের শীর্ষ তিনটি কোম্পানিই ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তিনটি কোম্পানিরই ১০ শতাংশ দর হারায় গতকাল। এগুলো ছিল আর্স্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স ও প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয কোম্পানি ছিল সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ। দরপতনে ডিএসই’র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ন্যাশনাল ব্যাংক, অ্যাপোলো ইস্পাত, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বিআইএফসি, তুং হাই টেক্সটাইলস ও ফোনিক্স ফিন্যান্স।