রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিচ্ছেন অচেনা দিওমান্দে
Printed Edition
ক্রীড়া ডেস্ক
মাত্র ১৮ মাস আগেও ফুটবলবিশ্বে প্রায় অচেনা ছিলেন ইয়ান দিওমান্দে। তখন ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর তো দূরের কথা, অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছেই তার নাম ছিল অপরিচিত। অথচ মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আইভরি কোস্টের এই তরুণ উইঙ্গার এখন বিশ্বের অন্যতম সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার দ্বারপ্রান্তে। তার সম্ভাব্য দলবদল হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আলোচিত চুক্তি।
আরবি লাইপজিগ থেকে দিওমান্দেকে দলে নিতে রিয়াল মাদ্রিদ ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করতে প্রস্তুত। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে তিনি লাইপজিগের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি বিক্রিত খেলোয়াড় হবেন। একই সাথে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসেও সবচেয়ে বড় অঙ্কের চুক্তিগুলোর একটি হবে এটি। এমনকি দিওমান্দে ইতিহাসের সবচেয়ে দামি আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবেও নতুন রেকর্ড গড়তে পারেন।
দিওমান্দের উত্থান যে কতটা দ্রুত, তা তার সাম্প্রতিক ক্যারিয়ার দেখলেই বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ডিএমই একাডেমিতে খেলতেন তিনি। তবে প্রতিষ্ঠানটি ফুটবলের চেয়ে বাস্কেটবল কার্যক্রমের জন্যই বেশি পরিচিত। ইউরোপে পেশাদার ফুটবলে সুযোগ পাওয়ার আগে চেলসি, বোর্নমাউথ, ক্রিস্টাল প্যালেস, রেঞ্জার্স ও অলিম্পিয়াকোসের মতো ক্লাবে ট্রায়াল দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোথাও স্থায়ী সুযোগ পাননি।
শেষ পর্যন্ত স্পেনের ক্লাব লেগানেস তার প্রতিভায় আস্থা রাখে। লা লিগায় মাত্র ১০ ম্যাচ খেলেই দিওমান্দে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। তার গতি, দুর্দান্ত ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক দক্ষতা দ্রুতই ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে। এরপর ২০ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে নেয় জার্মান ক্লাব আরবি লাইপজিগ।
লাইপজিগে যোগ দেয়ার পর যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যান দিওমান্দে। প্রথম পূর্ণ মৌসুমেই সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৩ গোল করার পাশাপাশি ১০টি গোলে সহায়তা করেন তিনি। তার অসাধারণ গতি ও সৃজনশীলতা তাকে জার্মান ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত করে। দুই উইংয়েই খেলতে সক্ষম দিওমান্দে মূলত বাঁ পায়ে নয়, ডান পা ব্যবহার করেই আক্রমণে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন।
তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে লিভারপুল, পিএসজিসহ ইউরোপের একাধিক বড় ক্লাব তাকে দলে নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। তবে শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদই তাকে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যায়। আইভরি কোস্টের হয়ে বিশ্বকাপেও খেলেছেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার পরিচিতি আরো বাড়িয়েছে।
তবে দিওমান্দের সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। মাত্র নয় বছর বয়সে ফুটবলের জন্য বাড়ি ছেড়ে প্রায় ৭০ মাইল দূরের একটি ক্লাবে যোগ দেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তখন তিনি ইংরেজি ভাষাও জানতেন না। এরপর ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে একের পর এক ট্রায়াল দিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
নিজেই একসময় বলেছিলেন, সবাই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিল এবং কেন তাকে নেয়া হচ্ছে না, সেটিও তাকে জানানো হতো না। এমন কঠিন সময়ের পর লেগানেস যখন তাকে পেশাদার চুক্তির সুযোগ দেয়, তখনই বদলে যায় তার ভাগ্য।
তবে পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুতেই ব্যক্তিগত জীবনে বড় আঘাত পান দিওমান্দে। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগায় অভিষেকের কিছু দিন পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার বোন রক্সান মারা যান। এই আকস্মিক মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সেই শোককে বুকে নিয়েই এগিয়ে গেছেন দিওমান্দে। প্রত্যাখ্যান, সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত বেদনা পেরিয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে এখন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর একটিতে যোগ দেয়ার অপেক্ষায়। অচেনা এক তরুণ থেকে রিয়াল মাদ্রিদের সম্ভাব্য রেকর্ড-চুক্তির খেলোয়াড় দিওমান্দের উত্থান তাই আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বিস্ময়কর গল্প।