মিয়ানমারের ১৪ প্রদেশে বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠী ৭০ লাখ। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার সময় জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি আরাকানে বাস করত। সে সময় আরাকান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ ছিল। আয়তন ছিল ২০ হাজার বর্গমাইল। পরে রোহিঙ্গাদের সংখ্যালগিষ্ঠ করার প্রয়াসে এর উত্তরাংশের আরাকান পাবর্ত্য জেলা এবং দক্ষিণাংশের একটি অঞ্চলকে আরাকান থেকে পৃথক করে শাসকরা। বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার ২০০ বর্গমাইল।
সামরিক শাসকরা বার্মার নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রেখেছে। একইভাবে আরাকানের ইতিহাস মুছে দিতে এর নাম রাখাইন করা হয়েছে। ১৭৮৫ সালে বার্মান রাজা বোদাপাউপিয়া আরাকান আক্রমণ করে অঞ্চলটি দখল করে নেন। তিনি আরাকান থেকে রোহিঙ্গা ও মগ উভয় সম্প্রদায়কে তাড়িয়ে দেন। তারা চট্টগ্রামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে বার্মা ব্রিটিশদের দখলে এলে রোহিঙ্গা ও মগরা আবার ফিরে যায়। যদিও মগদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামের কক্সবাজারে থেকে যায়। ওখানে তারা রাখাইন নামে পরিচিত। রোহিঙ্গারা বংশপরম্পরায় দীর্ঘ এক হাজার বছর যাবৎ বার্মার আরাকান প্রদেশে বসবাস করে আসছে। আরাকান একদা মুসলিম শাসনাধীন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। ১৯৩৫ সালের ভারতশাসন আইন দ্বারা বার্মাকে ভারতবর্ষ থেকে আলাদা করা হয়। ব্রিটিশ শাসনে থাকার সময় আরাকানে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। এতে মগ তথা রাখাইনদের দ্বারা হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের থেকে বার্মা স্বাধীনতা পাওয়ার পর তখনকার শাসক অং সান (তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী সু চি’র পিতা) আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। অং সান সামরিক বাহিনী দ্বারা নিহত হন। পরে উনু ক্ষমতাসীন হলে তিনিও অং সানের ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার স্বীকার করে নেন। নেউইন-এর শাসনামলে তিনি সর্বপ্রথম রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। নেউইন ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৬২ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আরাকান ত্যাগে বাধ্য হয়। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে চলে আসে তারা। এদের কেউই পরে আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেনি। বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী ১৯৭৮ সালে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অত্যাচার ও নিষ্পেষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য হয়। ১৯৭৯ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির অধীন এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন শুরু হলেও তা মাঝপথে থমকে যায়। এ চুক্তিতেও রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আগমনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পাঁচ লাখ অতিক্রম করে। নিকট অতীতে অত্যাচার ও নৃশংসতার মাত্রা আগের সব ইতিহাস ছাড়িয়ে গেলে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন ঘটতে থাকে, এখনো আসছে তারা।
জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর পরিচালিত দু’টি শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজার; কিন্তু এর বাইরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এই অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বর্তমানে যারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এদের নাম ও ঠিকানা সঠিকভাবে লিখে রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ে অভাব আছে। নাম ও ঠিকানা লিখে রাখতে না পারলে তারা একসময় এই দেশের মূল স্রোতের নাগরিকদের সাথে মিশে যাবে। সে ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাবর্তন দুরূহ হবে। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এ দেশের অসাধু লোকের সহায়তায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে যে হারে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সে তুলনায় প্রত্যাবর্তনের সংখ্যা নগণ্য। তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সেভাবে এগিয়ে আসেনি। অনেকের অভিযোগ— বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সেভাবে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় শতভাগই মুসলমান। মিয়ানমারে তারা যখন থেকে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তার অনেক পরে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের খ্রিষ্টানরা স্বাধীনতার আন্দোলনে নামে। দক্ষিণ সুদানে বসবাসরত খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী ধর্মীয় ও জাতিগত সত্তার দাবিতে স্বাধীনতা চায়। ২০০২ এবং ২০১১ সালে এই দুই অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মিয়ানমারে ১৪টি প্রধান জাতিসত্তা এবং দুই শতাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে। এরা সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এদের নাগরিকত্ব কখনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি।
আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামক যে সংগঠনটির নাম উদ্ধৃত করে পুলিশ ও সেনা চৌকিতে সশস্ত্র হামলার কথা বলছে মিয়ানমার সেনা কর্তৃপক্ষ। বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে সম্পূর্ণ আরাকান অঞ্চল রোহিঙ্গাশূন্য করার জন্য আরসার নামে বার্মার সেনা শাসকরাই এ অভিযানটি পরিচালনা করেছে। আরাকানের যে ভৌগোলিক অবস্থান তাতে বাংলাদেশ ও ভারত ব্যতীত অপর কোনো রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে এ ধরনের সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান যে অবস্থান তাতে রাষ্ট্রটি কোনোভাবেই এ ধরনের সশস্ত্র পন্থায় রোহিঙ্গাদের দাবি আদায়ের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে না।
যেকোনো দেশের নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, অত্যাচার করলে তারা বাঁচার শেষ অবলম্বন হিসেবে সশস্ত্র পন্থা গ্রহণে বাধ্য হয়। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের জন্মগত অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে এগিয়ে আসতে হবে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে। সেটি না পারলে উচিত হবে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে আরাকানের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করা। সেখানে মিয়ানমারের শাসকরা শান্তিশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে ব্যর্থ হলে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী দিয়ে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আর বাংলাদেশের উচিত হবে, এতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক