রেকর্ড টিকাদানেও কেন বাংলাদেশে হামে হাজারো মৃত্যু
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি (২০ মিলিয়ন) টিকাদানে নতুন রেকর্ড গড়ার মধ্যেও হামের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর সংখ্যা সহস্রাধিক ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের মাত্র ১৩২ জন রোগী এবং শূন্য মৃত্যুর তুলনায় চলতি বছরে এই মহামারী রূপ স্বাস্থ্য খাতের অতীতের গাফিলতি, তথ্যের ভুল হিসাব ও সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
লক্ষ্যমাত্রার ভুল হিসাব ও তথ্যের অসঙ্গতি
অপ্রতুল লক্ষ্যমাত্রা : টিকাদান কর্মসূচি শুরুর সময় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন)। অথচ পরবর্তীতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণের সময় এই একই বয়সী শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ; অর্থাৎ প্রায় ৬০ লাখ শিশু প্রাথমিক হিসাব থেকেই বাদ পড়ে গিয়েছিল। গড় পরিসংখ্যানে আসল চিত্রের গোপনীয়তা : জাতীয় পর্যায়ে ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি টিকাদানের হার দেখা গেলেও স্থানীয় বা দুর্গম অঞ্চলগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। এই পকেট বা গোষ্ঠীগুলোতে ভাইরাসের সংক্রমণ অবাধে ছড়িয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
রুটিন টিকাদানের হার হ্রাস : ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজের হার ৮৮.৬% থেকে কমে ৮৬% এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৯% থেকে কমে ৮০.৭%-এ নেমে আসে। করোনা মহামারী, অপপ্রচার ও টিকা-সঙ্কোচের মূল কারণ।
টিকা ঘাটতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা : ২০২১ সালের পর বড় ধরনের কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশে চরম টিকা সঙ্কট দেখা দেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব এপ্রিলে সারা দেশে রূপ নেয়।
শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের চরম ঝুঁকি
বয়সসীমার নিচের শিশুদের মৃত্যু : হাসপাতালে রেকর্ড করা মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশই ছিল ১৫ মাসের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের নিচে; যা তাদের প্রথম ডোজ টিকা নেয়ার নির্ধারিত বয়সের চেয়েও কম। সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা (হ্যার্ড ইমিউনিটি) ভেঙে পড়ায় তারা সহজেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটেছে নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য পূর্ববিদ্যমান শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতার কারণে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, কেবল জাতীয় হিসাব বা গড় সংখ্যা দিয়ে এই মহামারী থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক ‘মাইক্রো-প্ল্যানিং’, যাতে প্রতিটি এলাকার বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকাদান করা যায়। পাশাপাশি প্রয়োজনে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে; তা না হলে টিকাদান কর্মসূচিতে অতীতের কিছু ভুলত্রুটি, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে কম হিসাব বা ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় টিকাদানের আওতা কম থাকার মতো বিষয়গুলোর সম্মিলিত প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। যেমন ২০২১ সালের শুরুর দিক থেকে বাংলাদেশ দেশব্যাপী কোনো সম্পূরক টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা না হওয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে টিকা পায়নি এমন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি বড় অংশ তৈরি হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত অনেক শিশুই টিকা পায়নি এবং তারা আগে থেকেই বিভিন্ন অসুস্থতায় ভুগছিল অথবা তাদের মধ্যে গুরুতর কোনো জটিলতা দেখা দিয়েছিল। হাসপাতালে নথিভুক্ত ৫৭টি মৃত্যুর মধ্যে ৫০টির ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ২৭ আগস্ট ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক বছর বয়সী শিশু সাইফ হাসানের মৃত্যু হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা শরীয়তপুরের বাসিন্দা এই শিশুটির হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ নেয়ার কয়েক দিন পরই জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তার পরিবারের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, টিকার কারণেই কি সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রেবাশ পাল জানান, সাইফ আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের কোনো সমস্যায় ভুগছিল এবং টিকাটি কার্যকর হওয়ার আগেই সম্ভবত সে হামে আক্রান্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সেই সংক্রমণ তার আগের অসুস্থতাকে আরো জটিল করে তোলে।’
সাইফের মৃত্যু হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জকেই তুলে ধরে। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এক হাজার ৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে; যার মধ্যে ১০০ জন ছিলেন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের রোগী এবং ৯০৯ জনের মৃত্যু হামজনিত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। অথচ সরকারি তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া এই জরুরি কর্মসূচিতে এক কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) শিশুর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার (১৯.৭৫ মিলিয়ন) শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আরেকজন মহামারী বিশেষজ্ঞ- যিনি বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ করতে চাননি- বলেন যে, কর্তৃপক্ষের উচিত বয়স, টিকাদানের ইতিহাস ও অবস্থান অনুযায়ী আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং সেই ফলাফল কাজে লাগিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা। ওই সব জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট টিকাদান কর্মসূচি না চালালে সামগ্রিক আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকে- এমনটিই মতো ওই বিশেষজ্ঞের। রোগীদের চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসকরাও এই ঘাটতির প্রমাণ পাচ্ছেন।