ই-বর্জ্যে জনজীবন নীরব বিপর্যয়ে

বছরে উৎপন্ন ২৮ লাখ টন

আবুল কালাম
Printed Edition

দেশে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক পণ্য বা ই-বর্জ্যে জনজীবনে ডেকে আনছে নীরব বিপর্যয়। ব্যবহার অযোগ্য মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, ব্যাটারি, চার্জার, প্রিন্টার ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় তা পরিবেশের জন্য বড়ো হুমকি হয়ে উঠেছে। এর বিষাক্ত পদার্থে মাটি ও পানি দূষণের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ই-বর্জ্যে থাকা সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানির সাথে মিশে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এসব দূষিত উপাদান ভূগর্ভস্থ পানিতে পৌঁছে পানির মান নষ্ট করে। দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত ধাতু খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরে জমা হতে পারে।

এ ছাড়া নদী, খাল ও জলাশয়ের পাশে ই-বর্জ্য ফেলে রাখলে বৃষ্টির পানিতে বিষাক্ত পদার্থ ধুয়ে সরাসরি জলাশয়ে মিশে যায়। এতে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। খোলা স্থানে ই-বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে বায়ুদূষণও বৃদ্ধি করে।

একাধিক সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৮ লাখ টন পর্যন্ত ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয় এতে বলা হয়, শুধু বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ৩.৫ লাখ টনের কাছাকাছি, যাতে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কার্যকর পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা না থাকায় এই মূল্যবান সম্পদের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে এবং একই সাথে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি), বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ইন্টারন্যাশনাল টেকনো কমিউনিকেশন, ইউনাইটেড ন্যাশনস ইনস্টিটিউট ফর ট্রেনিং অ্যান্ড রিচার্স, বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটেস্টিক তাদের পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরে। এতে দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পুনর্ব্যবহার, নীতিগত সমস্যা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে আইসিটি ব্যবহার ও ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রসার সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার নিমতলী, চাঁনখারপুল, ধোলাইখাল, এলিফ্যান্ট রোড, দয়াগঞ্জ, সদরঘাট, কাকরাইল, মতিঝিল, মিরপুর, পাটুয়াটুলি ও গুলিস্তান এলাকায় ই-বর্জ্য সংগ্রহ, মেরামত, খোলা ও পুনর্ব্যবহারের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি পরিচালিত হয়। এসব এলাকায় অপরিকল্পিত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-বর্জ্য শুধু পরিবেশগত ক্ষতিকর নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বয়ে আনে। কার্যকর আইন প্রয়োগ, আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে এক দিকে যেমন মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ কমবে, অন্য দিকে ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করে দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে। নয়তো ই-বর্জ্যরে কারণে মাটি, পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব আরো বাড়বে।

এ বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো: মাহামুদুর রহমান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে ই-বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তার ভাষ্য, বিষাক্ত ভারী ধাতু মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির মানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ ছাড়া ই-বর্জ্যরে বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, ক্যানসারের ঝুঁকি এবং শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ই-বর্জ্যে থাকা সোনা, রূপা, তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় দেশের অর্থনীতিও সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।