অপতথ্য জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি সংসদে সর্বদলীয় ঐক্যে জোর
সিএফবির গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরবিরোধী ও ভিত্তিহীন বয়ান, অপতথ্য এবং প্রপাগান্ডার বিস্তার সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। এ প্রবণতা মোকাবেলায় জাতীয় ঐকমত্য গঠন, নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গত সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘মিথ্যা বয়ান, অপপ্রচার ও অনৈক্য : স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও ঐক্যের প্রতি হুমকি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে। সিটিজেনস ফোরাম, বাংলাদেশ (সিএফবি) এ আলোচনার আয়োজন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইপিজিএডির চেয়ারম্যান ড. ইশারফ হোসেন এবং সমাপনী বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান।
সূচনা বক্তব্যে ড. মামুন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নতুন যাত্রা শুরু হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও প্রপাগান্ডার বিস্তার প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এসব তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, মিথ্যা বয়ান মোকাবেলায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বরং সত্যভিত্তিক বয়ান প্রতিষ্ঠা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা জরুরি। অতিরিক্ত আইন প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, তথ্য গোপন করলে সঙ্কট আরো জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি একটি কার্যকর ও স্থায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানসম্মত ও নৈতিক শিক্ষা দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে, যারা অপতথ্য প্রচারে জড়ায় না।
ড. ইশারফ হোসেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতির কথা তুলে ধরে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও ভূরাজনীতি বিষয়ক উপাদান শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা বলেন, অপতথ্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি; এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আরো সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও যাচাই না করেই বিশ্বাস করেন। তাই বিভ্রান্তি দূর করতে দ্রুত সরকারি প্রতিক্রিয়া জরুরি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস বলেন, অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে; তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা স্টিমের সিইও সোহেল রানা বলেন, মিথ্যা তথ্য এখন বৈশ্বিক সমস্যা। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলো অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী গুজবকে একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপতথ্য ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সর্বদলীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রয়োজন রয়েছে।
গোলটেবিলে মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে- সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা, ডিজিটাল সাক্ষরতা উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, মিথ্যা তথ্য ও বিভাজনমূলক প্রচারণা প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ, শিক্ষাবিদ ও তরুণদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম গঠনের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তারা আরো বলেন, একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে তথ্যের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো জাতির সম্মিলিত দায়িত্ব।
সবশেষে বক্তারা মত দেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা ও ঐক্যের স্বার্থে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে একটি সর্বদলীয় জাতীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, এই নীতির ভিত্তিতে জাতীয় সংহতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন : ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম, নাসিম ফেরদৌস, আশরাফুল হুদা, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, ইকতেদার আহমেদ, অধ্যাপক নকিব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) মুস্তাফিজ, মোস্তফা কামাল মজুমদার, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) মাহমুদ হোসাইন, সামসুল আলম লিটন, মো: সারওয়ার আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. সাফাত আহমেদ, মো: শামীম হাসান, ড. শাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত, ড. মাহফুজ কবির, শফিউল আলম, ব্যারিস্টার নাশিথ রহমান, ড. মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ড. মো: তৌফিকুল ইসলাম, মেহেদী হাসান পলাশ, মো: শরিফুল হক, আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, আবিদুল ইসলাম খান, রেজাউল করিমসহ নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।