৯ জুলাই ছিল ঝড়ের প্রচ্ছন্ন আভাস

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

৯ জুলাই দিনটি ছিল ঝড়ের আগের নীরবতা। টানা দুই দিনের ‘বাংলা ব্লকেড’-এ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের সড়ক-মহাসড়ক অচল করে দেয়া শিক্ষার্থীরা এদিন কৌশল বদলায়। রাস্তায় দীর্ঘ অবরোধ না হলেও আন্দোলনের গতি থামেনি। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও নতুন কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলন সুসংগঠিত রূপ নেয়। এই দিনটি আন্দোলনের পরবর্তী বিস্ফোরক অধ্যায়ের ভিত্তি তৈরি করে।

সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন জারি রাখেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট সমাবেশ করেন। কোথাও মানববন্ধন, কোথাও বিক্ষোভ মিছিল- সবার একটিই দাবি, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।

বুয়েটে শিক্ষার্থীরা মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন। তাদের দাবি, এই আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় চাকরিতে মেধার যথাযথ মূল্যায়নের। একই বক্তব্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচিতেও প্রতিধ্বনিত হয়।

দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের নতুন দিকনির্দেশনা দেন। তারা ১০ জুলাই দিনব্যাপী সারা দেশে আবারো ‘বাংলা ব্লকেডের ঘোষণা দেন। শুধু নগরের মূল সড়ক নয়- মহাসড়ক ও রেলপথও অবরোধের আওতায় আসে।

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা এক দফা দাবিও স্পষ্ট করেন। তাদের ভাষ্য, সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত পরিসরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রাখা এবং আইন করে কার্যকর।

আন্দোলনের বাইরে থাকা দুই শিক্ষার্থীর করা আইনি আবেদনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা ওই আবেদনের সাথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান সমন্বয়করা। তাদের অভিযোগ আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করা এবং আদালতের প্রক্রিয়াকে সামনে এনে রাজপথের আন্দোলনকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা চলছে।

অন্য দিকে সরকারের পক্ষ থেকেও এদিন সংলাপের ইঙ্গিত আসে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও আন্দোলনকারীদের আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দেন, কেবল আদালতের রায়ের অপেক্ষা নয়, রাজনৈতিক ও নীতিগত সমাধানও প্রয়োজন।

৯ জুলাইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্দোলনের সাংগঠনিক বিস্তার। বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরদিনের কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সমন্বয়, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, জরুরি সেবার যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশনা সব কিছুই পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়।

মূলত ৯ জুলাই ছিল আন্দোলনের কৌশলগত পুনর্গঠনের দিন। আগের দুই দিনের অবরোধে সারা দেশে যে জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরো সংগঠিত করা হয়। সরাসরি সংঘাতের বদলে আন্দোলনের লক্ষ্য, দাবি এবং পরবর্তী কর্মসূচি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয় জনসাধারণের সামনে।

পরদিন ১০ জুলাইয়ের দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। ৯ জুলাই কেবল একটি বিরতির দিন নয়; বরং আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়া প্রস্তুতির দিন হিসেবেই স্মরণীয়।