ভোলার গ্যাসে ভোলাতেই শিল্পায়নের চিন্তা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় গ্যাসগ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপজেলা ভোলায় বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান মিললেও, মূল ভূখণ্ডের পাইপলাইনে গ্যাসসংযোগ স্থাপনে দীর্ঘ সময় (প্রায় সাত বছর) প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় গ্যাস অব্যবহৃত বা অবরুদ্ধ রাখার ঝুঁকি এড়াতে সরকার দ্বীপজেলাটিতে স্থানীয় ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পায়নের ওপর জোর দিচ্ছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কৌশলগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন।
ভোলা থেকে বরিশাল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে বৃহত্তর জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে গ্যাস সরবরাহ করতে একাধিক নদী পারাপার, পাইপলাইন নির্মাণ, কমপ্রেশন স্টেশন স্থাপন এবং জমি অধিগ্রহণের মতো জটিল ও বহুস্তরীয় অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করতে হয়। সরকারি নথিপত্র ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস নিতে প্রায় সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে এই দীর্ঘ অপেক্ষায় বসে না থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে স্থানীয় গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নকে ফাস্ট ট্র্যাক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা
স্থানীয়ভাবে গ্যাসের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু মেগা প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে।
সার কারখানা : দেশের কৃষি খাতের সার আমদানিনির্ভরতা কমাতে ভোলায় একটি নতুন গ্যাসভিত্তিক ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও লজিস্টিকস ব্যবসার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।
৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র : স্থানীয় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং সিস্টেম লস ও সঞ্চালন বাধা কমাতে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরো একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এলএনজি রূপান্তর ও সরবরাহ : পাইপলাইনের সাত বছরের দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ভোলার গ্যাসকে ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত এলএনজি করে ছোট পরিসরে মূল ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড এবং বিসিক শিল্পনগরীতে সরবরাহের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।
গ্যাসের মজুদ বনাম বাণিজ্যিক বাস্তবতা
শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র মিলিয়ে ভোলার সম্ভাব্য গ্যাসসম্পদের বড় ভাণ্ডার রয়েছে। তবে ভূতাত্ত্বিক সম্ভাব্য মজুদ এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস এক বিষয় নয়। অতীতে সিএনজি আকারে সিলিন্ডারে করে গ্যাস স্থানান্তরের উদ্যোগ অতিরিক্ত পরিবহন ও কমপ্রেশন ব্যয়ের কারণে লাভজনক প্রমাণিত হয়নি। ফলে ভোলার গ্যাসের প্রকৃত ‘ষধহফবফ পড়ংঃ’ বা পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যয় বিবেচনা না করে শুধু মজুদ দেখিয়ে শিল্পায়ন শুরু করলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
ভোলার গ্যাসসম্পদকে কেবল কয়েকটি বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ভোলা গ্যাসভিত্তিক শিল্প মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন করা জরুরি। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত : উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের রিজার্ভের নিরপেক্ষ ও অডিটকৃত মূল্যায়ন। গ্যাসভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানার মধ্যে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার কোটা নির্ধারণ। গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার পর ভোলার শিল্প ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প জ্বালানি বা স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ।
দ্বীপজেলা ভোলাকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং স্বল্পমেয়াদি স্থানীয় শিল্পায়ন- এই দুইয়ের সমন্বিত বাস্তবায়নই দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে এবং জাতীয় গ্যাসসঙ্কটের একটি স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারে।