বাবার আসনে নির্বাচন করছেন রবিন
অবহেলিত ঢাকা-৪ আসনে পরিবর্তনের অঙ্গীকার
মাদকই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাদককারবারিরা সাধারণত প্রভাবশালী মহল বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকে। আমি এ বিষয়ে প্রশাসনের সাথে আলোচনা করেছি। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং সেসব তথ্য প্রশাসনের কাছে দিয়েছি। ইতোমধ্যে কয়েকজন বড় মাদককারবারি গ্রেফতার হয়েছে, বাকিরা পলাতক। মাদককারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান হবে জিরো টলারেন্স।
Printed Edition
ঢাকা-৪ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন। তার পিতা অবিভক্ত ঢাকা ৪/৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ সালাহউদ্দিন আহমেদ। পিতার নির্বাচনী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে এলাকার দীর্ঘ দিনের নাগরিক সঙ্কট, মাদক, জলাবদ্ধতা ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের প্রতিবেদক ইকবাল মজুমদার তৌহিদ।
প্রশ্ন : ঢাকা-৪ আসনের প্রধান সমস্যা কী বলে আপনি মনে করেন?
তানভীর আহমেদ রবিন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেতরে আমাদের এই এলাকা সবচেয়ে অবহেলিত। দক্ষিণ সিটি গঠনের সাত-আট বছর পার হলেও এখানে কার্যকর কোনো নাগরিক সেবা গড়ে ওঠেনি। খেলার মাঠ নেই, কমিউনিটি সেন্টার নেই, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই, এমনকি স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কোনো জেনারেল হাসপাতালও নেই। জনসংখ্যার তুলনায় নাগরিক সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল।
প্রশ্ন : এলাকাবাসী মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বিগ্ন। আপনি কিভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করতে চান?
রবিন : মাদকই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাদককারবারিরা সাধারণত প্রভাবশালী মহল বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকে। আমি এ বিষয়ে প্রশাসনের সাথে আলোচনা করেছি। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং সেসব তথ্য প্রশাসনের কাছে দিয়েছি। ইতোমধ্যে কয়েকজন বড় মাদককারবারি গ্রেফতার হয়েছে, বাকিরা পলাতক। মাদককারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান হবে জিরো টলারেন্স।
প্রশ্ন : তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে আপনার কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?
রবিন : অবশ্যই আছে। আমি চাই তরুণরা গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হোক। আমার পরিকল্পনা রয়েছে- প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে একটি করে পাঠাগার নির্মাণ করব। এসব পাঠাগার হবে মননশীল পরিবেশ- যেখানে নবীন-প্রবীণ, নারী-পুরুষ সবাই মিলিত হতে পারবে। এখানে প্রশিক্ষণ, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকবে। এতে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হবে এবং তরুণরা মাদক ও কিশোর গ্যাং থেকে দূরে সরে পড়ালেখা ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগী হবে।
প্রশ্ন : জলাবদ্ধতা ঢাকা-৪ এলাকার দীর্ঘ দিনের সমস্যা। এর মূল কারণ কী?
রবিন : কয়েক বছর আগেও এই এলাকাটি অনেকটা গ্রামীণ ছিল। নিচু এলাকা হওয়ায় এখানে মাছের ঘের ও কৃষিকাজ হতো। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। খালগুলো দখল হয়ে গেছে, ফলে পানি ঠিকমতো নিষ্কাশন হয় না। বৃষ্টির সময় ঘরে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে, জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
প্রশ্ন : জলাবদ্ধতা নিরসনে আপনার সমাধান কী?
রবিন : এটি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের আগেই ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে। নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করব।
প্রশ্ন : আপনার বাবা সালাহউদ্দিন আহমেদ এই আসন থেকে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন। বাবার আসনে নির্বাচন করার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
রবিন : এটি আমার জন্য দায়িত্বের বিষয়। এই আসনের মানুষ আমার বাবার নেতৃত্ব ও কাজ দেখেছে। আমি চাই সেই রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে নতুন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এগিয়ে নিতে। শুধু অতীতের স্মৃতির ওপর নয়, বর্তমান সমস্যার বাস্তব সমাধান দিয়েই মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাই।
প্রশ্ন : নির্বাচিত হলে ঢাকা-৪ আসনকে কোথায় দেখতে চান?
রবিন : আমি চাই ঢাকা-৪ হোক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন, নিরাপদ ও মানবিক একটি এলাকা। যেখানে তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবে, সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পাবে, আর মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের কোনো ঠাঁই থাকবে না। পরিবর্তনই আমার মূল অঙ্গীকার।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজধানীর শ্যামপুর ও কদমতলী থানার ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ সংসদীয় আসন। আসনটি দীর্ঘ দিন ধরে নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৭৮ বছর আগে অঞ্চলটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় এলেও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জন, আর বসবাস করেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন থেকে এ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে তিনবার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন চারবার ও জাতীয় পার্টি বিজয়ী হয়েছে তিনবার। এ ছাড়াও আসনটিতে দু’বার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মীর আবুল খায়ের নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনীত আনোয়ার উদ্দিন শিকদার এ আসনে নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আসনটিতে বিজয় লাভ করেন সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। ১৯৯১ ও ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটি থেকে বিজয় লাভ করেন বিএনপির বর্তমান প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিনের বাবা সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে সালাহউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান মোল্লার কাছে পরাজিত হলেও ২০০১ সালে আসনটি আবার পুনরুদ্ধার করেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সানজিদা খানম এ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও ২০১৪ ও ২০১৮-এর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আসনটিতে বিজয়ী হন আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। সর্বশেষ ২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আওলাদ হোসেন আসনটিতে নির্বাচিত হন।
জনসংখ্যার তুলনায় এলাকায় পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা নেই। খেলার মাঠ ও কমিউনিটি সেন্টারের সঙ্কট প্রকট। সর্বস্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি এবং দীর্ঘ দিনের জলাবদ্ধতা বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন- জামায়াতের সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ মো: মোসাদ্দেক বিল্লাহ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সালেহ আহমেদ সোহেল, বাসদের মো: জাকির হোসেন, জনতার দলের মো: আবুল কালাম আজাদ, কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ ফিরোজ আলম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।