সৌন্দর্যের আধার গড়াই নদী : সাকী মাহবুব

Printed Edition
pas
সৌন্দর্যের আধার গড়াই নদী : সাকী মাহবুব

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত গড়াই নদী যেন প্রকৃতির আঁকিবুঁকি। পদ্মার বুক থেকে জন্ম নেয়া এই নদী কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুরে প্রথম আলো ছড়ায়, তারপর ধীরে ধীরে বয়ে যায় ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মাগুরার মাঠঘাট পেরিয়ে। শেষমেশ মধুমতির বুকে মিশে গিয়ে যেন প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়। গড়াই পদ্মার বৃহত্তর শাখা নদী। এর প্রাচীন নাম ‘গৌরী নদী’। গড়াই পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলা পাড়ি দিয়ে পাংশা উপজেলার দক্ষিণাঞ্চল ছুঁয়ে বৃহত্তর যশোর, বরিশাল ও খুলনা জেলা ভেদ করে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৭ কিলোমিটার।

গড়াই নদীর তীরজুড়ে গ্রামীণ জীবনের স্নিগ্ধতা। ভোরের আলোয় নদীর জলে রুপালি ঝিলিক, দুপুরে কৃষকের কণ্ঠে ধানক্ষেতের গান, আর সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের রঙিন আভা সবমিলিয়ে গড়াই যেন এক চলমান কবিতা। বর্ষায় নদীর জল ফুলে ওঠে, তখন এর সৌন্দর্য হয়ে ওঠে আরো মোহনীয়। নৌকার পাল উড়তে থাকে, জেলেরা জাল ফেলে মাছ ধরে, আর নদীর বুকজুড়ে বাতাসে ভেসে আসে লোকগানের সুর।

গড়াই নদী শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি কুষ্টিয়ার লোকসংস্কৃতিরও প্রতীক। লালন ফকিরের গান, বাউলদের সুর, আর গ্রামীণ উৎসবের আনন্দে গড়াই নদী যেন এক জীবন্ত মঞ্চ। নদীর তীরে বসে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা ও গান, যা আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তোলে।

গড়াই নদীর ওপর নির্মিত সেতুগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। হরিপুর সেতু, গড়াই রেল সেতু, সৈয়দ মাসউদ রুমি সেতু কিংবা কুমারখালী সেতু- সবই নদীর বুকে মানুষের পদচিহ্ন। নদীর পানি কৃষি সেচে ব্যবহৃত হয়, মাছ ধরা হয়, আর নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে জীবিকা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে,এই প্রাণপ্রবাহী নদীও আজ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন। উজানে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব এবং স্বাভাবিক পলি জমার কারণে গড়াই নদী দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শীতকালে নদীর অনেক অংশের পানি শুকিয়ে যায়, যা নৌপরিবহন ও মাছের আবাসস্থলের জন্য হুমকিস্বরূপ। অন্য দিকে শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালির বর্জ্য নদীর পানিকে দূষিত করছে, যা জলজ জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

গড়াই নদী বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। এটি শুধু একটি নদী নয়, এটি বাংলার জনপদের প্রাণ। এই নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে টেকসই ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ড্রেজিং এবং দূষণ রোধ করতে হবে। গড়াইকে রক্ষার অর্থই হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই অপরূপ সৌন্দর্যের আধারকে আগামী প্রজন্মের জন্য সজীব ও প্রাণবন্ত রাখতে হবে। দিনের আলো ফোটা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আমাদের সাহায্য করে। সেটি হতে পারে আমাদের পরিবারের মানুষ, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এমনকি অচেনা মানুষও থাকতে পারে সে তালিকায়। আমরাও কখনো কখনো তাদের উপকারে আসি। কিন্তু আমরা ক’জনই বা সানন্দচিত্তে এই উপকারের কথা মনে রাখি? ক’জনই বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি পাশের মানুষটাকে? ক’জনে প্রকাশ করি অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা? অধিকাংশ সময়ই আমরা তা করি না। আমরা মনে করি, এটি আমাদের নিজস্ব পাওনা কিংবা এটি আমাদের ন্যায্য অধিকার। অথচ একথা নিরেট সত্য যে, জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে কারো না কারো অবদান থেকেই যায় এবং সেটি স্বীকার করা মনুষ্যত্বের পরিচয়। তাই কিছু না পারি অন্তত প্রতিদান হিসেবে উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বটে।

মনে রাখা উচিত- কৃতজ্ঞতা শুধু সৌজন্য বা ভদ্রতা নয়; এটি মানুষের এক বিশেষ মানবিক গুণ যা উত্তম চরিত্রের পরিচায়ক। যে মানুষ যত বেশি কৃতজ্ঞ পৃথিবীতে সে মানুষ ঠিক ততটাই সফল। কৃতজ্ঞ মানুষ মাত্রই শান্তিপ্রিয়। তার মধ্যে অহঙ্কার থাকে না। তিনি আপাদমস্তক বিনয়ী। অন্যের ভালো কাজকে মূল্য দিয়ে থাকেন। অন্যের সাফল্যে আনন্দ পান। নিজের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। কারো উপকারের বিনিময়ে তিনি প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়- হরহামেশা আমরা এই মানবীয় গুণ থেকে পিছিয়ে পড়ছি। কৃতজ্ঞতা যেন এখন এক ভুলে যাওয়া শব্দে পরিণত হয়েছে।

আজকের প্রতিযোগিতামূলক যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি, সেখানে মানুষ কেবলই যান্ত্রিক। কারো দিকে কারো যেন ফিরে তাকানোর ফুরসত নেই। আত্মীয়তার বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা, সম্মান, মায়া, মমতার পাঠগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত আমার আমার বলে ছুটে চলছি, কেউ কারো সাহায্য-সহযোগিতা বা অবদানকে মনে রাখছি না। কেউ কাউকে সহযোগী ভাবতে পারছি না। সবসময় প্রতিযোগিতার মনোভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। অথচ হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানাতে টাকা খরচা হয় না, একটা ধন্যবাদ জানালে সম্মান কমে না; বরং সেটি করতে পারলে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে, সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। মনে শান্তি আসে। অন্যকেও শান্তি দেয়া যায়।

কারো মনে আনন্দ জাগাতে পারা কাউকে ভালো বলতে পারা, ভালো বাসতে পারা, কাউকে মূল্যায়ন করতে পারা এক বিশেষ শিক্ষা। সবাই সেটি পারে না। তবে মানুষ হিসেবে আমাদের এ গুণটিকে ষোলআনা রপ্ত করা উচিত।

আজকে মানুষ তার শিক্ষা, জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছে ঠিকই, উন্নতির ধারাবাহিকতাও অব্যাহত রাখতে পেরেছে সত্য; কিন্তু মানবিক বোধ বা কৃতজ্ঞতার জায়গা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যে মা-বাবা সন্তান মানুষ করছে, একসময় সে সন্তান মা-বাবার ত্যাগ ভুলে যাচ্ছে, যে শিক্ষক দিন-রাত পরিশ্রম করে পরের সন্তানকে মানুষ রূপে গড়ছেন, সময় পার হলে সে ছাত্র তার শিক্ষককে অগ্রাহ্য করছে। ছোটরা বড়দেরকে মানছে না, বড়রাও ছোটদের আদর্শ হওয়ার রাস্তা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে ... সংখ্যায় মানুষ বেড়েছে বটে; কিন্তু মানবিক মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে- এগুলো মনুষ্যত্ব অর্জনের পথে বাধা।

আমাদের ঝুলিতে এত এত সার্টিফিকেট, পেটে এত এত শিক্ষা-দীক্ষা অথচ দিন দিন আমরা কেমন জানি নিরামিষ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের হীনম্মন্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা যেন ক্ষুদ্রতাকে লালন-পালন করছি। অথচ একটু সদিচ্ছা থাকলেই আমাদের সম্পর্কের সুতোগুলো শক্ত হতে পারত। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রিয়ভাজন হতে পারতাম। সম্পর্কগুলো শিথিল হতো না, ভেঙে পড়ত না। সত্যিকার অর্থে সৃষ্টির সেরা জীব হতে পারতাম। কৃতজ্ঞ হলে সৃষ্টিকর্তাও অনুগ্রহ করেন।

মহান আল্লাহ পাক বলেন- ‘তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু

ঘটাবেন, পুনরায় তোমাদেরকে জীবন দান করবেন। নিশ্চয় মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা হজ, আয়াত-৬৬) মহান আল্লাহ পাক আরো বলেন- ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি তোমাদেরকে আরো বেশি অনুগ্রহ দান করব।’ (সূরা ইবরাহিম-৭)

আসুন, আমরা মানবিক হই, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। সমাজ-সংসারকে এগিয়ে নিই আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে। কারো কাজকে ছোট না ভেবে উদারচিত্তে ভালো বলার চর্চা করি। কাউকে তুচ্ছ না ভেবে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেই। মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখি। চলনে-বলনে, জীবনযাপনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তুলি। উপকারীর উপকার স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ না করি। আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা যেন উদারতাকে মলিন করতে না পারে, আমাদের ব্যস্ততা কিংবা যান্ত্রিকতা যেন সৌজন্য প্রদর্শনকে ভুলিয়ে না দেয়। কারণ, কৃতজ্ঞতা হারিয়ে গেলে মানবতা নিঃশেষ হয়ে যায়।

লেখক : শিক্ষক, আড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

মধুখালী, ফরিদপুর