কঁক্ করক্ কঁক্
Printed Edition
হারুনুর রশীদ সাঈম
মোরগটা খুব নাদুস-নুদুস। অল্পদিন হলো গলা ছেড়ে ডাকতে শিখেছে। তাতেই তার দাপট অনেক। ভোরের আজানের আগেই তার বারবার কঁক্ করক্ কাঁক্ ডাকে আশপাশে কারো ঘুমানোর জো থাকে না।
ওর মালিক রহিম মিয়ারও আর আজানের অপেশক্ষায় থাকা লাগে না। সুবহে সাদিকের আগে জাগতে পারলে দু’-চার রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আজান পর্যন্ত জিকির আসকার করেন। তারপর আজান হয়ে গেলে সুন্নাত নামাজ ঘরে পড়ে জামাতে শরিক হতে মসজিদে ছুটে যান। আর এদিকে মোরগটা অনবরত ডেকেই চলে। রহিম মিয়ার স্ত্রী উঠে নামাজ পড়ে আকাশটা ফর্সা হওয়া পর্যন্ত কুরআন তিলাওয়াত করেন। এরমধ্যেই আকাশটা ফর্সা হয়ে ওঠে। পশ্চিম দিগন্তে রঙিন আভা ছেড়ে সূর্য উঁকি মারতে শুরু করে। এত সময় যেন মোরগটার আর ধৈর্য কুলোয় না। ও যেন খোপের দরজা ভেঙে বের হয়ে পড়বে। ঘরে বন্দী হয়ে থাকা যেন ওর স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা। ওর মন চায় মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে আর ঘুরে বেড়াতে।
সকালে একবার বের হতে পারলে সন্ধার আগে আর যেন ঘরে ফিরতেই মন চায় না ওর। প্রায় সন্ধায় তো এমনভাবে লুকোচুরি খেলা শুরু করে যে, খুঁজে বের করতে হাফিয়ে ওঠেন রহিম মিয়ার স্ত্রী। মাঝেমধ্যে রহিম মিয়াও বিরক্ত হয়ে যান। এক সন্ধায় অনেক কষ্টে মোরগটাকে ধরে মুখের ওপর আলতো একটা চড় মেরে রহিম মিয়া বললেন, বেশি জ্বালাবি তো জবাই করে কাবাব বানিয়ে ফেলব।
কয়েক দিন পরের কথা। রহিম মিয়ার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি ছোটখাটো জঙ্গল। দুটো কাঠবিড়ালি খাবার সন্ধানে এ গাছ থেকে ও গাছে ছুটে বেড়াচ্ছিল। আন-মৌসুম হওয়ায় কোনো গাছে ফল-ফলাদি ছিল না। একটি কলাগাছের নিচে খোসাবিহীন কয়েকটি কলা পড়ে রয়েছে। একটি কাঠবিড়ালি তা খেতে উদ্যত হলে অপর কাঠবিড়ালিটা বাধা দিয়ে বলল, খোসাবিহীন কলা খেলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। না জানি তাতে কত বিষাক্ত পোকামাকড় মুখ লাগিয়েছে। কুকুর-বিড়াল প্রস্রাব করেছে। তাছাড়া রুচিরও তো একটা ব্যাপার স্যাপার আছে। আমরা তাজা ছাড়া বাসিটা খেতে যাব কেন? উপর দিকে তাকিয়ে দেখল কাঁধিতে একটি কলা ঝুলে আছে মাত্র। বাকি কলাগুলো কারা যেন খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে। বাধা দেয়া কাঠবিড়ালিটা বলল, চলো আমরা আজ ওটা খেয়েই ক্ষুধা মেটাই। দুজন দৌড়ে গিয়ে গাছে উঠে মজা করে কলাটা খেতে শুরু করল। এমন সময় রহিম মিয়ার মোরগটা দৌড়াতে দৌড়াতে জঙ্গলে এসে ঢুকে পড়ল। জঙ্গলে এসে খুব উৎফুল্ল সে। আজ আর মালিক তাকে ধরতে পারবে না। ভালো লাগে না তার ওই বদ্ধ খাঁচায় সারারাত আবদ্ধ হয়ে থাকতে। মনে মনে বলল, স্বাধীনভাবে থাকতে চাই আমি। চাই মুক্ত স্বাধীন চলতে। এই জঙ্গলেই থাকব আমি। আর পাখির মতো ডানা ঝাপটে উড়ব। ইচ্ছেমতো খাব আর ঘুরব। আমায় আর পায় কে! আমাকে কাবাব বানাবে মালিক! সে সুযোগ আর পাবে না সে। ভেবে খুশিতে গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে কঁক্ করক্ কাঁক্। তখন ছিল সন্ধ্যারাত। মোরগটার আওয়াজ শুনতেই বনের ভেতরে থাকা তিনটি শিয়াল তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে মোরগটিকে। মোরগটি ভয়ে আঁতকে ওঠে। বাঁচার যে আর কোনো উপায় নেই! এখন তার মনে পড়ে মালিকের কথা।
হায়, খাঁচায় বন্দী জীবনটাই তো ভালো ছিল। আমার নিরাপত্তার জন্যই তো মালিক জোর করে আটকিয়ে রাখত আমায়। সব স্বাধীনতা যে স্বাধীনতা নয়, কতই না ভালো হতো আগে যদি বুঝতাম! তাহলে আজ আর এ বিপদে পড়তে হতো না। হায় কী করলাম আমি ভেবে বাঁচার শেষ চেষ্টায় পালানোর চেষ্টা করতেই একটি শিয়াল খপ করে পা কমড়ে ধরে ফেলে ওকে। বাকি দুটো শিয়ালও ঝাঁপিয়ে পড়ে মোরগটার ওপর। মোরগটা তখন শেষ ডাক দিয়ে ওঠে কঁক্ করক্ কাঁক্। মুহূর্তের মধ্যে মোরগটিকে চিড়ে ফেড়ে খেয়ে ফেলে শিয়ালগুলো। মোরগের ছোট বড় পেখমগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় যত্রতত্র। ছলছল চোখে কাঠবিড়ালি দুটো এ দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ওদের খাবার কলাটা ছুটে নিচে পড়ে যায় বুঝতে পারে না ওরা। টের পেয়ে দু’জন লেজ উঁচিয়ে ছোটে নিচের দিকে।