দুর্গম চরাঞ্চলে আট একর জমিতে খেজুর বাগান
Printed Edition
বোরহান উদ্দিন রব্বানী শরীয়তপুর
নিরাপদ খেজুর রস সংগ্রহ, খাঁটি গুড় উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা এবং গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও ঐতিহ্য ফেরাতে সখিপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে স্বপ্নের ডানা মেলছে প্রবাসীর খেজুর গাছের বাগান। এরই মধ্যে বাগানের খেজুরের ডানাগুলো উঁচু আকাশের দিকে ওড়তে শুরু করেছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে নিরাপদ ও মানসম্মত খেজুর রস সংগ্রহ করার স্বপ্ন নিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা, গাছের সঠিক পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা জানান বাগান পরিচালক। এতে ভেজালমুক্ত খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে শরীয়তপুর জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের জেলাগুলোতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান বাগানের ইনচার্জ সোলেমান কাজী।
চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা খেজুরগাছের বাগানটিকে ঘিরে নানা প্রজাতির পাখির কোলাহলে মুখর হয়ে উঠছে এলাকা। প্রকৃতি ও নানা প্রজাতির পাখিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকেও অনেকই ভিড় করছেন বাগানটিতে। প্রবাসী উদ্যোক্তার এমন উদ্যোগ স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ও গ্রামীণ ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বাগানের ইনচার্জ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শীত এলেই গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে গাছে ঝুলতে দেখা যেত মাটির হাঁড়ি। ভোর হলেই ভেসে আসত মাটির চুলায় জ্বলা খেজুরের গুড়ের ঘ্রাণ। কালের বিবর্তনে চিরচেনা সেই দৃশ্য এখন আর তেমন দেখা যায় না। ইটভাটা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নগরায়ণ আর অবহেলার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য খেজুরগাছ। এর সাথে বিপন্ন হতে বসেছে গ্রামবাংলার শীতের ঐতিহ্যের পিঠ-পুলির পারিবারিক উৎসব। এই সঙ্কটকে মাথায় রেখে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের আনু সরকারকান্দি গ্রামে লন্ডন প্রবাসী ইয়াকুব কাজী।
২০২৩ সালে তার বাড়ির পার্শ্বে আট একর জমিতে সাড়ে তিন হাজার দেশীয় খেজুরগাছ রোপণ করেন। ইয়াকুব কাজীর এ উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছে স্থানীয় লোকজন। তার লক্ষ্য নিরাপদ খেজুর রস সংগ্রহ, খাঁটি গুড় উৎপাদন এবং গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে পুনর্জাগরিত করা। এতে শুধু খাঁটি খেজুর রস ও গুড়ের সঙ্কটই দূর হবে না ফিরতে শুরু করবে প্রাণ-প্রকৃতির নবরূপ। চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা এই খেজুরগাছের বাগানটিকে দেখতেও অনেকেই আসছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা খাদেমুল ইসলাম বলেন, এর আগে দেশীয় প্রজাতির খেজুরগাছের বাগান স্বেচ্ছায় করতে দেখিনি।
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব শরীয়তপুরের উপদেষ্টা কবি শাহজালাল মিয়া বলেন, যেভাবে ইটভাটাসহ নানান আগ্রাসনে খেজুরগাছ বিলীন হয়েছে, তাতে পরিবেশ প্রকৃতি রক্ষা আর গ্রামীণ ঐতিহ্য ফেরাতে এমন উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। শরীয়তপুরের পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক রাসেল নোমান বলেন, খেজুরগাছ কেবল রস বা গুড়ের সংস্থান করে না, মাটির ক্ষয় রোধ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, খেজুরগাছ একটি কম যতেœর গাছ। একবার বড় হয়ে গেলে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। একটি গাছ ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত রস দিতে পারে। এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক একটি বিকল্প ফসল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। খেজুরগাছের বাগানে সাথী ফসল আবাদ করে কৃষকরা অতিরিক্ত আয়ও করতে পারেন। আমরা মাটির উপযোগিতা যাচাই করে দুর্গম চরাঞ্চলসহ উপযুক্ত জমিতে উন্নত জাতের খেজুরগাছ রোপণে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি।