গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল বিরোধীদের
বাধাহীন লংমার্চে পরমতসহিষ্ণুতার নতুন নজির
Printed Edition
চট্টগ্রামের পর এবার রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানিসঙ্কট নিরসনসহ ছয় দফার একই দাবিতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সরকার পতনের ‘এক দফার’ ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যপক্ষ সরকার ও বিরোধী জোটের বর্তমান অবস্থানকে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার এক জটিল সমীকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। উভয়েই এক দিকে সংসদের কার্যপ্রণালীতে অংশ নিচ্ছে, অন্য দিকে রাজপথে একে অপরকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিরোধীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে চাপে রাখা। একই সাথে সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথকে শক্তির মূল উৎস হিসেবে ধরে রাখা।
গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের সাথে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সঙ্কট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের আয়োজন করে বিরোধী এই জোট। তাদের দাবিগুলো হলো- গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সঙ্কীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। জোটের শীর্ষ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের লালদীঘির সমাবেশে বলেছেন, এ আন্দোলন জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। লংমার্চের দিন ঢাকার এক সমাবেশে জোটের অন্যতম দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেছেন, সরকার এই লংমার্চে বাধা দিলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা সরকারকে বলব, আপনারা দাবিগুলো মেনে নেন। যদি দাবি না মানেন, ছয় দফা এক দফা হবে, সেটা হবে সরকারের পদত্যাগ।
সূত্র মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এই জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের বিধান না থাকায় সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ ধরনের শপথ নেননি। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির জন্য বিরোধী দল থেকে সদস্যদের নাম চাওয়া হলেও তারা তা দেয়নি। এর পর থেকে বিরোধী দল ধারাবাহিকভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লংমার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৫ সেপ্টেম্বও ঢাকা-চট্টগ্রাম, লংমার্চ পালন করা হয়। এ ছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লংমার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় জোটের মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে কি না এবং সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকার ও বিরোধী শিবিরের সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি কেমন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিরোধী জোটের নেতারা একে সরকার পতনের আন্দোলন বলতে নারাজ। তাদের ভাষ্য মতে, এটি মূলত অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে জনমত গঠন এবং সরকারকে নির্বাচনী ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেয়ার একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রয়াস। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের কেন্দ্রে জনসম্পৃক্ত দাবিগুলো থাকলেও এর পেছনে নিজেদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী শক্তি প্রদর্শন এবং বিএনপির বাইরে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী কৌশল কাজ করছে।
এ দিকে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী জোট একটি ‘সাংবিধানিক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল’ ভূমিকা পালনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আসছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন ও কোটাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে চিফ হুইপ এবং সরকারি দলের মন্ত্রীদের সাথে বিরোধী দলের কিছুটা বাগি¦তণ্ডা লক্ষ করা গেছে, যা স্পষ্ট করে যে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের টানাপড়েন রয়েছে।
সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, এই লংমার্চ ও নতুন আন্দোলনকে খুব একটা সহজভাবে নিচ্ছে না তারা। সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা প্রকাশ্যেই এর সমালোচনা করছেন। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির মতে, সরকার দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ছয় মাস পেরিয়েছে। এই অল্প সময়ে সব ঐতিহাসিক সঙ্কট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়, এটি বিরোধীদের বুঝতে হবে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন একে গণ-আকাক্সক্ষার পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, জাতীয় সংসদ যখন সন্তোষজনকভাবে সচল ও প্রাণবন্ত রয়েছে, তখন সংসদের বিতর্ককে দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা- তারা বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে স্বাগত জানান, তবে এর আড়ালে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে, তার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। রাজপথে বড় শোডাউন না করে সংসদে বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আসার জন্য তারা বিরোধী জোটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে এ বি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু নয়া দিগন্তকে বলেন, লংমার্চের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের চলমান সঙ্কটে বিপর্যস্ত সাধারণ নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে জনসমর্থন তৈরি করা। আমরা সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে চাই। ক্ষমতার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় জনগণের আকাক্সক্ষার সাথে যাতে কোনো ধরনের বেইমানি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই কর্মসূচি।
এ দিকে বিএনপি সরকারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নানা দাবি নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলের লংমার্চ কর্মসূচিতে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা দেয়নি সরকার। মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের একটি নতুন বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকার।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল শর্তই হলো শক্তিশালী বিরোধী দল এবং তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের স্বাধীনতা। এবারের লংমার্চে সরকার যেভাবে বাধা না দিয়ে সহনশীলতা দেখিয়েছে, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে কাজ করাই বিরোধীদের কাজ। সরকারের উচিত হবে গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জন আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে বাধা না দিয়ে সরকার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির এমন ইতিবাচক ভূমিকার জন্য তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপি যে শ্রদ্ধাশীল, এটি তারই প্রমাণ। যদিও বিগত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। তিনি বলেন, বিরোধীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতাগুলোও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। জনসম্পৃক্ত দাবিগুলো সরকারকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারকে এক দিকে যেমন সহায়তা করা বিরোধীদের কাজ, তেমনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিসহ জন-আকাক্সক্ষা গুলোও বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে চাপে রাখা বিরোধীদের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অবিশ্বাস ও দূরত্বের রাজনীতি পরিহার করে সরকার ও বিরোধী দল যদি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা এবং একটি টেকসই ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদেরই বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।