ট্রাইব্যুনালে রক্তভেজা গণ-অভ্যুত্থানের বিবরণ
‘ছেলের পায়ে গুলি, ছাদ থেকে লাফিয়ে আমার আত্মরক্ষা’
Printed Edition
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিনগুলোয় রাজপথ যখন তরুণদের তাজা রক্তে রাঙানো হচ্ছিল, ঠিক তখন নিজের সন্তানের রক্তেভেজা প্যান্ট আর বারুদের গন্ধে ভারী বাতাস বুকে চেপে বেঁচে থাকার এক অলৌকিক লড়াই লড়ছিলেন ৫৫ বছর বয়সী এক বাবা। একাধারে সন্তানের শরীরে শাসকগোষ্ঠীর বুলেটের ক্ষত, অন্য দিকে তাকে আশ্রয়ের অপরাধে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ঘেরাও; জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াল রাত পার করে ছাদ থেকে ছাদে লাফিয়ে বাঁচতে হয়েছিল তাকে। বুলেটের গর্জন আর স্বজন হারানোর আর্তনাদের মাঝে রচিত সেই ভয়াল দিনগুলোর দুঃসহ সাক্ষী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন তিনি, চাইলেন ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে উপস্থিত হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় নিজের এই রোমহর্ষক জবানবন্দী পেশ করেন তিনি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে মামলার ২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে জবানবন্দী দেয়া এই সাক্ষীর নাম-পরিচয় গোপন রেখেছে ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার সময় বাসা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় তার বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ওই একই দিনে নিউ মার্কেট ২ নম্বর গেট এলাকায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের যৌথ গুলিতে নিহত হন ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ। আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে শহীদ হন আরো এক আন্দোলনকারী। জুমার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় অন্তত ছয় থেকে সাতজন প্রাণ হারান, যার মধ্যে ১১ বছরের শিশু তামিম শিকদারও ছিল। সাক্ষী নিজে বেশ কয়েকজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
জবানবন্দীতে সাক্ষী আরো বলেন, ওই দিন ১৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে কারফিউ জারি ও আন্দোলনকারীদের ‘দেখামাত্র গুলির’ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সেই বৈঠকে তার পাশে ছিলেন রাশেদ খান মেনন ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম।
কারফিউ ঘোষণার পরদিন, ২০ জুলাই সকাল থেকে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে তল্লাশি ও তাণ্ডব শুরু করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মারধর করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়, তাদের বইপুস্তক পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়া হয়। ২০ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত টানা নির্যাতন চলে এবং এই সাক্ষীর বাসায়ও তল্লাশি চালানো হয়।
আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় নিজের জীবন বাঁচাতে ২৪ জুলাই সাক্ষী চট্টগ্রামে চলে যান। তবে হামলা থামেনি; তার সাতকানিয়ার গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ ও আওয়ামী লীগ হামলা চালায়। ২৬ জুলাই তিনি পুনরায় ঢাকায় ফেরেন।
২৬ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানকালে সাক্ষী আহত আন্দোলনকারীদের খাবার, ওষুধ, চিকিৎসাসেবা ও পোশাক পৌঁছে দিয়ে সাহায্য করতে থাকেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ২ আগস্ট রাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার আজিমপুরের বাড়ি ঘেরাও করে। চার দিক থেকে অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রাণের তাগিদে তিনি নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পাশের ছাদে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে আত্মগোপন করেন।
পরদিন, ৩ আগস্ট ভোরে তিনি পুনরায় চট্টগ্রামে পালিয়ে যান। সেদিন রাতেই তার সাতকানিয়ার বাড়িতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ হামলা চালায়। ওই দিনই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার পতনের একদফা দাবি ঘোষণা করেন। তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রাণের ভয়ে তিনি সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে উপস্থিত হতে পারেননি।
৪ আগস্ট সাক্ষী চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট এলাকায় আইনজীবীদের সাথে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যোগ দেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের এলোপাথাড়ি গুলিতে তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র এ কে এম নুরুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন।
নুরুল্লাহর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য বড় ছররা গুলি লাগে এবং ঊরুর মাংস ছিঁড়ে যায়। চরম দরিদ্র পরিবারের সন্তান নুরুল্লাহর চিকিৎসায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করেন, কিন্তু ছেলেটি স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। ওইদিন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখতে পান সাক্ষী এবং অনেককে চিনে ফেলেন। একই দিন আন্দরকিল্লা, বকশিরহাট, চট্টগ্রাম কোর্ট, নিউমার্কেট, ষোলশহর ও ওয়াশামোড়ে গুলিবর্ষণে হাজারো মানুষ আহত-নিহত হন। এতে সাক্ষীর নিজস্ব তিনজন কর্মচারীও ছররা গুলিতে আহত হন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৪ আগস্ট রাতে আট-নয়বার গাড়ি বদলে চরম ঝুঁকিতে তিনি পুনরায় ঢাকায় ফেরেন।
৫ আগস্ট সকালে আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে আজিমপুর-নিউমার্কেট এলাকা থেকে গণভবনের উদ্দেশে রওনা হন সাক্ষী। সকালে চানখারপুল, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের খবর পান তারা। বাধা পেরিয়ে বেলা ১টার দিকে শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবর পেয়ে তারা গণভবনের আনন্দ মিছিলে যোগ দেন।
বেলা ৩টার দিকে বন্ধু খলিলুর রহমানের ফোন পান তিনি। বাড্ডায় পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের ঘেরাওয়ের মুখে থাকা বন্ধুকে বাঁচাতে বিকেল ৫টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত গলিতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে খলিলুর রহমানের শরীরে সাত শতাধিক ছররা গুলির ক্ষত দেখতে পান তিনি। তাকে উদ্ধারের পর পাশে একটি বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে পরে হাসপাতালে পাঠায়। সরকারি চিকিৎসায় পাঁচ মাস থাইল্যান্ডে চিকিৎসা শেষে খলিলুর রহমান দেশে ফিরলেও আজ তিনি চিরতরে পঙ্গু।
জবানবন্দীর শেষ পর্যায়ে এই প্রত্যক্ষদর্শী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আন্দোলনকারী নিরীহ ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা ও পঙ্গু করার পেছনে শেখ হাসিনার অন্যতম মূল পরামর্শদাতা ছিলেন ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
জবানবন্দী গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামি কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেননের আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করেন। রাষ্ট্র পক্ষে শুনানি পরিচালনায় অংশ নেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, তারেক আবদুল্লাহ ও মামুনুর রশিদ।