চোখে আলো নেই, তবু জীবনযুদ্ধে অদম্য সোহাগ

Printed Edition

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)

বয়সের সাথে সাথে দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন সোহাগ মিয়া। এখন খুব কাছের মানুষকেও কেবল ছায়ার মতো দেখেন তিনি। একা চলাফেরার ক্ষমতাটুকুও প্রায় নেই। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই যেখানে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেন, সেখানে ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

সোহাগ মিয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জাফরাবাদ গ্রামে। তিনি দৃষ্টিহীনতাকে পুঁজি করে বসে থাকেননি; বরং আত্মমর্যাদা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনযুদ্ধ। গ্রামের বাজারে একটি ছোট টঙ দোকান ভাড়া নিয়ে পান, সিগারেট, বিস্কুট আর চিপস বিক্রি করেন। কেবল অনুমানের ওপর ভর করে পানের খিলি বানিয়ে হাসিমুখে তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে। এভাবেই চলছে তার জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

সামান্য পুঁজির এই দোকানের আয়ে চার সদস্যের অভাবের সংসারটি কোনো রকম টেনে নিচ্ছেন সোহাগ। স্ত্রী নাসিমা, এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সহায়-সম্বল নেই। চোখের আলো না থাকলেও সোহাগের মনে আছে আত্মসম্মানবোধ। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতাকে তিনি অসম্মানজনক মনে করেন। তাই নিজের শ্রমে অর্জিত যৎসামান্য আয়েই দিনাতিপাত করছেন তিনি।

সোহাগ মিয়া জানান, শৈশব থেকেই তার চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে। ৯-১০ বছর বয়সে ধরা পড়ে ‘গ্লুকোমা’। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, এ রোগ পুরোপুরি সারার নয়। তবে চোখে লেন্স লাগালে কিছুটা উপকার মিলবে। তখন অনেক কষ্টে সাড়ে সাত হাজার টাকা জোগাড় করে এক চোখে লেন্স লাগিয়েছিলেন। তাতে কিছুটা আলো ফিরে পেলেও ২০-২৫ বছর পর সেই লেন্সের কার্যক্ষমতাও শেষ হয়ে গেছে। তাই এখন আর তেমন চোখে দেখেন না।

সম্প্রতি চিকিৎসকরা তাকে আবারো লেন্স এবং বিশেষ চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য সোহাগের নেই। আক্ষেপ করে তিনি জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পাননি তিনি। শেষমেশ নিরুপায় হয়ে ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে এক মৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে একটি কার্ড সংগ্রহ করেন তিনি। সোহাগ আরো জানান, মাত্র দুই-তিন হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তার দোকানটি চলছে। হাতে কিছু টাকা থাকলে পানের পাশাপাশি মুদি মালামাল বিক্রি করে আয় বাড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু অভাবের সংসারে করতে পারেননি।

সোহাগের স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, দৃষ্টিহীন জেনেও মা-বাবার পছন্দে তাকে বিয়ে করেছিলাম। সোহাগ আমাকে খুব ভালোবাসে ও সম্মান করে। দোকানে যদি কিছু পুঁজি বাড়ানো যেত, তবে সন্তানদের নিয়ে আরেকটু ভালোভাবে চলতে পারতাম। সোহাগের এই হার না মানা মনোভাবকে সম্মান জানান স্থানীয় প্রতিবেশী ও ক্রেতারা। তারা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সোহাগ যেভাবে মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন, তা সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সোহাগের এই সংগ্রামকে টিকিয়ে রাখতে বিত্তবানদের এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।