যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার ‘পরিবেশ তৈরিতে’ সচেষ্ট তেহরান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গতকাল গতকাল রোববার জানিয়েছেন, ইরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনা করছে না, কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, আরাকচি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র যা লঙ্ঘন করেছে তার ক্ষতিপূরণ না দেয়া পর্যন্ত আলোচনা পুনরায় শুরু করা সম্ভব নয়। তিনি আরো যোগ করেন, মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার নতুন পথ খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরাকচি জানান, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নতুন একটি সামুদ্রিক পথ নির্ধারণ নিয়ে ওমানের সাথে আলোচনা ভালো অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হচ্ছে, যেকোনো পুনর্ব্যবহার কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আক্রমণ চালানোর পর আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র রূপ নেয়। তেহরান ও ওয়াশিংটন এপ্রিলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং পরবর্তীতে তাদের সামরিক সঙ্ঘাত অবসান ও একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে জুনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। তবে সঙ্ঘাত সমাধানের আলোচনার খবরের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ বোমাবর্ষণ স্থগিত করার আগে দুই পক্ষ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে একে অপরের ওপর হামলা চালানোর পর গত মাসে এই চুক্তিটি ভেঙে পড়ে।
ওমানের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে তবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের শর্ত
ইরান গতকাল রোববার জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীতে নতুন নৌপথ নির্ধারণসংক্রান্ত ওমানের সাথে তাদের একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য শর্ত পূরণ করলেই কেবল প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেয়া হবে বলে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করার আগে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। এক মার্কিন কর্মকর্তা শুক্রবার রয়টার্সকে জানান যে, ইরান ও ওমানের মধ্যকার চুক্তিটি প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং তা দ্রুতই নৌপথটি পুনরায় খুলে দিতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গতকাল রোববার বলেন, দুই দেশের মধ্যকার প্রণালীসংক্রান্ত সমঝোতাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তবে অন্যান্য শর্ত পূরণ না হলে এটি খোলা হবে না বলে শনিবারের দেয়া বক্তব্য তিনি পুনরায় স্পষ্ট করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি
যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানে বিমান হামলা শুরু করে বলেছিল যে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি দিয়ে অঞ্চলে হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। জুনে তারা ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও জুলাইয়ে পারস্য উপসাগরে ইরানি জাহাজের ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপ করে, যাকে তেহরান পূর্বেই ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কোনো বাধা ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারসংক্রান্ত চুক্তিটি ঘোষিত হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে। ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো ইরানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত থাকবে। মার্কিন সরকারের এই মন্তব্য একটি সমঝোতার দিকে সূক্ষ্ম ধারাক্রম নির্দেশ করে, যা রয়টার্সকে দেয়া সূত্রের তথ্যানুযায়ী তেহরানকে প্রণালী দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে বলে মনে হচ্ছে, যদিও জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছেন এটি সহজসাধ্য নয়।
চুক্তিটির সর্বশেষ অবস্থা অস্পষ্ট ছিল এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, অন্যান্য বিষয়গুলোও এখানে প্রভাব ফেলবে। আরাকচি বলেন, প্রণালীটি পুনরায় চালু করা ইরানের ওপর ব্যাপক আক্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেয়ার শর্তের ওপর নির্ভর করবে। ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করা, ইরান এবং তার লেবানিজ, ফিলিস্তিনি, ইয়েমেনি ও ইরাকি মিত্রদের ওপর আগ্রাসন বন্ধ করা, ইরানের ওপর থেকে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করার শর্তগুলো তালিকাভুক্ত করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত শনিবার জানিয়েছে যে, ইরান তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, তবে এ বিষয়ে ইরানের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরামকোর জাজান শোধনাগারে আগুন লেগেছিল, তবে পরবর্তীতে কোনো হতাহত ছাড়াই তা নিভিয়ে ফেলা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সামাল দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাক্ষাৎ
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গতকাল রোববার জানিয়েছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জুলাইয়ের শেষের দিকে তার মেয়াদকালের তৃতীয় বছরের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং আধাসামরিক বাহিনীর এক নেতা ভবিষ্যতে খামেনির ভিডিও দৃশ্য প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত মার্চে তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাহাকে সাক্ষাৎ পাওয়ার বিষয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।
গত ২১ জুলাই প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন যে, সর্বোচ্চ নেতার সাথে তার যোগাযোগ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু আগস্টের শুরুতে তিনি বলেন যে, খামেনির সাথে যোগাযোগ করা খুবই কঠিন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, জুলাইয়ের শেষের দিকের ওই বৈঠকে সামরিক বিষয়াবলী এবং অর্থনীতি, যার মধ্যে রয়েছে সম্পদ নিশ্চিতকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক অংশীদারদের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর আগে মে মাসেও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল যে, পেজেশকিয়ান খামেনির সাথে কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছিলেন, যা মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে তাদের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্যে আসা বৈঠক ছিল।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় আলী খামেনি নিহত হন এবং এতে মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন বলে খবর পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগেও তিনি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরে নীরব ভূমিকা পালন করতেন। বাসিজ সংগঠনের উপপ্রধান কাসেম কোরাইশি গতকাল রোববার জানান, খামেনিকে সাধারণ মানুষের মাঝে ও রাজপথে চলাফেরা করতে এবং সশস্ত্রবাহিনীর কমান্ডারদের সাথে বৈঠক করার দৃশ্য সংবলিত ভিডিও ও অন্যান্য নথি ভবিষ্যতে প্রকাশ করা হবে। কোরাইশি বলেন, এই ভিডিও দৃশ্যগুলো আবারো ইরানের জনগণের শত্রু ও সমালোচকদের জন্য অপমান বয়ে আনবে। খামেনির স্বাস্থ্য ও জনসমক্ষে অনুপস্থিতি নিয়ে চলা বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার জবাব দিতেই তার এই মন্তব্য বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তি হোক বা না হোক ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে না দেয়ার অঙ্গীকার
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল রোববার অঙ্গীকার করেছেন যে, ওয়াশিংটন ও আরব দেশগুলোর সাথে কূটনীতির গতিপথ যাই হোক না কেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া থেকে বিরত রাখা হবে- যা তেহরান অর্জনের চেষ্টা করছে বলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন। এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, আমি আবারো জোর দিয়ে বলতে চাই। চুক্তি হোক বা না হোক, আমি যতক্ষণ প্রধানমন্ত্রী আছি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।